আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে বসন্তের ছোঁয়ায় গাছে গাছে ফুটে উঠেছে আমের মুকুল। ভোরের হালকা বাতাসে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠছে এলাকা। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে গাছ, পুকুরপাড় থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ আমবাগান—সবখানেই হলুদ-সবুজ মুকুলে শোভিত গাছের সারি চোখে পড়ছে।
মুকুলের এই সমারোহ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বার্তা নয়, এটি এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক আশারও প্রতীক। প্রতি বছর রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিত আম দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। ফলে মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মনে জেগে উঠছে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন।
কৃষকের আশা ও সতর্কতা
বাগান ঘুরে দেখা যায়, অনেক গাছেই ডালভর্তি মুকুল—কোথাও পাতাই চোখে পড়ে না। মৌমাছির গুঞ্জনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাগানগুলো। তবে কৃষকরা জানাচ্ছেন, মুকুলের সময়টাই সবচেয়ে সংবেদনশীল। শোষক পোকা বা হপার সময়মতো দমন না করা গেলে ফলন ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে অনেক চাষিই আগেভাগে পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
কৃষকদের মতে, এবার আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় মুকুল আগেভাগেই এসেছে এবং সংখ্যাও বেশি। কুয়াশা ও ঝড়ের বড় ধরনের ক্ষতি না হলে ভালো উৎপাদনের আশা করছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও প্রস্তুতি
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত গাছে পরিপূর্ণ মুকুল দেখা যাবে। গত বছরের তুলনায় এবার মুকুলের পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, মাঠপর্যায়ে সহকারী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করছেন এবং চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। গত বছর রাজশাহীতে হেক্টরপ্রতি আম উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১২.৭৫ টন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১২.৮ টন।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ১৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, যেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় আড়াই লাখ টন। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ জমিতে চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন জাত ও চাষ পদ্ধতির পরিবর্তন
এদিকে রাজশাহী অঞ্চলের পাশাপাশি নওগাঁ জেলায় আমবাগানের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। গত এক দশকে সেখানে আমচাষের জমি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকরা এখন দীর্ঘমেয়াদি বাগানের বদলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের পরিকল্পনায় আধুনিক জাতের আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আম্রপালি ও বারি আমের নতুন জাতের চাষও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, মুকুলে মোড়া আমবাগান শুধু বসন্তের সৌন্দর্য নয়—এটি রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য এক আশাব্যঞ্জক বার্তা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও আমের ভালো ফলনে ভরে উঠবে বাজার, পূরণ হবে কৃষকের স্বপ্ন।