ইশতেহার না কি উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির প্যাকেজ? বিএনপির ৯ অঙ্গীকার ও ৫১ দফা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ৬ দিন আগে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেটিকে দলটি “নতুন সামাজিক চুক্তি” বললেও বিশ্লেষকদের চোখে এটি একদিকে জনবান্ধব, অন্যদিকে আর্থিক ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্নের মুখে।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ঘোষিত এই ইশতেহার উপস্থাপন করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্লোগান— “সবার আগে বাংলাদেশ”, আর প্রত্যয়— “করব কাজ, গড়ব দেশ”। শুনতে শক্তিশালী, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে কতটা দাঁড়াবে?


 ‘ফ্যামিলি কার্ড’: জনকল্যাণ না বিশাল ভর্তুকির চাপ?

প্রতি নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য—এটি নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো:

  • দেশের মোট কত পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে?

  • বছরে এর জন্য কত হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি লাগবে?

  • রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে এটি টেকসই হবে কীভাবে?


  কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি: ভালো উদ্যোগ, কিন্তু বাজার কার হাতে?

কৃষি বীমা, সহজ ঋণ, রাষ্ট্রীয় বিপণন—সবই ইতিবাচক শোনায়।
তবে অতীতে কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে কোনো সরকারই পুরোপুরি সফল হয়নি। বিএনপি কীভাবে সেই চক্র ভাঙবে—ইশতেহারে স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই।


  এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী: নিয়োগ সম্ভব, নাকি কাগুজে সংখ্যা?

দেশব্যাপী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বড় ঘোষণা।
কিন্তু—

  • প্রশিক্ষণ অবকাঠামো কি আছে?

  • সরকারি হাসপাতালের বিদ্যমান সংকট আগে সমাধান হবে, নাকি নতুন নিয়োগ দিয়ে চাপ বাড়বে?


  শিক্ষা সংস্কার ও ‘মিড-ডে মিল’: স্বপ্ন নাকি বিশাল ব্যয়?

মিড-ডে মিল চালু হলে অপুষ্টি কমবে—এতে সন্দেহ নেই।
তবে এটি চালাতে গেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। অর্থের উৎস কী?


  তরুণদের কর্মসংস্থান: বাস্তব চাকরি নাকি প্রশিক্ষণভিত্তিক প্রতিশ্রুতি?

স্টার্টআপ, ভাষা দক্ষতা, ই-কমার্স—সবই আধুনিক চিন্তা।
কিন্তু বেকারত্ব কমাতে বছরে কত চাকরি তৈরি হবে—সংখ্যা অনুপস্থিত।


  ২৫ কোটি গাছ ও ২০ হাজার কিমি নদী খনন: সময়সীমা বাস্তবসম্মত?

পাঁচ বছরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দক্ষতা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা লাগবে—যা অতীতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।


  পেপাল চালু: পুরনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?

আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম PayPal চালুর প্রতিশ্রুতি নতুন নয়।
গত এক দশক ধরে এটি বহুবার রাজনৈতিক বক্তব্যে এসেছে। বাস্তবে কেন এখনো সম্ভব হয়নি—এই প্রশ্নের উত্তর ইশতেহারে নেই।


 ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী: সম্প্রীতি নাকি নতুন ভর্তুকি খাত?

ধর্মীয় সম্প্রীতির নামে রাষ্ট্রীয় সম্মানী চালু হলে এর কাঠামো কী হবে—তা অস্পষ্ট।


রাজনৈতিক বার্তা বনাম বাস্তব পরিকল্পনা

বিএনপি বলছে তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি করবে। দলটির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে
জিয়াউর রহমান–এর ১৯ দফা,
খালেদা জিয়া–এর ভিশন ২০৩০,
এবং তারেক রহমানের ৩১ দফা।

তবে সমালোচকদের মতে, ইশতেহারে লক্ষ্য আছে, কিন্তু অর্থায়ন, সময়সূচি ও জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট নয়


মূল প্রশ্নগুলো

 প্রতিশ্রুতিগুলোর মোট ব্যয় কত?
 রাজস্ব ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে?
 দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন কে নিশ্চিত করবে?
 পূর্বের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর কত শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছিল?


ইশতেহারটি নিঃসন্দেহে জনবান্ধব ও আবেগময় ভাষায় রচিত। কিন্তু এটি কতটা বাস্তবভিত্তিক আর কতটা নির্বাচনী কৌশল—তা নির্ভর করবে স্পষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপের ওপর।

নির্বাচনের আগে ভোটারদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—
এটি কি বাস্তব পরিবর্তনের রূপরেখা, নাকি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতির তালিকা?

error: Content is protected !!