ঐতিহ্যের ভাঙন : ‘মিনিস্টার বাড়ি’র ফটকে মানববন্ধন, ভেতরে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ

দেশ এডিশন (সিলেট) ব্যুরো ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

দেশ এডিশন (সিলেট) ব্যুরো ডেস্ক :

সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকায় সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘মিনিস্টার বাড়ি’ এখন ধ্বংসের মুখে। একদিকে বাড়ি রক্ষার দাবিতে চলছে মানববন্ধন, অন্যদিকে প্রাচীরের ভেতরে অব্যাহত রয়েছে ভাঙার কাজ। শনিবার দুপুরে বাড়ির ফটকের সামনে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে একাত্মতা প্রকাশ করে অংশ নেন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ (আইএবি), সেভ দ্য হেরিটেজ ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা। মানববন্ধনের সময়ও প্রাচীরের ভেতর থেকে ভাঙার শব্দ ভেসে আসতে থাকে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শুক্রবার বাড়িটি পরিদর্শন করে রবিবার পর্যন্ত ভাঙার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু নির্দেশনা উপেক্ষা করে শনিবার দুপুরে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা মেরে ভেতরে ভাঙার কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে।

মানববন্ধনে সূচনা বক্তব্য দেন পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিষদের ট্রাস্টি রেজাউল কিবরিয়া। সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী। বক্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও সংগঠক সৈয়দ মনির হেলাল, আইএবি সিলেটের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাশ, সাংবাদিক আব্দুল কাদের তাপাদার, মুহিত চৌধুরী, লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদক ইশরাক জাহান জেলী প্রমুখ। বক্তারা বলেন, সিলেট যেমন প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ, তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক দিয়েও সমৃদ্ধ। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস মানে ইতিহাসের একটি অধ্যায় নিশ্চিহ্ন করা। তাঁরা দ্রুত মিনিস্টার বাড়িটিকে জাতীয় ঐতিহ্য নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সংরক্ষণের আহ্বান জানান এবং বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধারের দাবিও তোলেন।

স্থপতি রাজন দাশ বলেন, “এই বাড়িটি জাতীয় ঐতিহ্য। সংবিধান ও প্রত্নতত্ত্ব আইন অনুযায়ী এটি সংরক্ষণ জরুরি। সিলেট সিটি করপোরেশন ও সড়ক বিভাগ বাড়ির অংশ বিনা অধিগ্রহণে ব্যবহার করছে, এসব জায়গা পুনরুদ্ধারে কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।” রবিবার সিটি করপোরেশন বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মানববন্ধন শেষ করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গবেষণা সহকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক শুক্রবার ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও পরদিন দেখা যায়, ভাঙারি ব্যবসায়ী মহরম আলী ১৮ লাখ টাকায় বাড়িটি কিনে ভাঙার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, প্রায় ৯৫ বছর আগে চুন-সুরকির ছাদওয়ালা ‘লেট-ব্রিটিশ’ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয় মিনিস্টার বাড়ি। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ—যিনি ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের শিক্ষা মন্ত্রী এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তাঁর নামেই ভবনটি পরিচিত ‘মিনিস্টার বাড়ি’ হিসেবে। এখানে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর আত্মজীবনীতে এই বাড়ির উল্লেখ করেছেন—এটি ছিল তাঁর দাদা আবদুল হামিদের ঐতিহাসিক আবাস।

সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী এই বাড়ি রক্ষায় এখন প্রশ্ন একটাই—প্রশাসন কি এবার দায়িত্ব নেবে, নাকি সিলেট হারাবে তার এক প্রজন্মের ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন?

error: Content is protected !!