চট্টগ্রাম বন্দরে বিদ্যুৎ বিভাগে লিফট কেনায় দুর্নীতি, তদন্ত দাবি উঠেছে

দেশ এডিশন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

বিদ্যুৎ বিভাগে সিন্ডিকেট গড়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ‘এ’ গ্রেডের নামে সরবরাহ নিম্নমানের ‘সি’ ও ‘ডি’ গ্রেড লিফট। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগে লিফট কেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সম্প্রতি অন্তত ছয়টি প্রকল্পে ‘এ’ গ্রেড লিফট সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে ‘সি’ ও ‘ডি’ গ্রেডের নিম্নমানের লিফট। প্রতিটি লিফটের দরপত্রমূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ টাকা, অথচ বাজারে এসব লিফটের দাম ১৮ লাখ টাকার বেশি নয়। ফলে ছয় প্রকল্পে মোট সাত কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে জানা গেছে।

‘আমার দেশ’-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অনিয়মে জড়িত রয়েছেন বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের পরিচালক এসএম সাইফুল ইসলাম, উপপ্রধান প্রকৌশলী মো. মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক এমপি আলি আজগর, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী ইঞ্জিনিয়ার আরশাদ পারভেজসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা মিলে বন্দরের অভ্যন্তরে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ‘ওয়ার্কস’ হিসেবে দেখিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠান এ অ্যান্ড জে ইন্টারন্যাশনাল-এর পক্ষে সুবিধা নিশ্চিত করেছেন।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, লিফট ক্রয় পণ্যশ্রেণির (গুডস) আওতাধীন হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ‘ওয়ার্কস’ ক্যাটাগরিতে টেন্ডার চালানোর ফলে মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

‘এ’ গ্রেড টেন্ডার, কিন্তু ডেলিভারি নিম্নমানের

২০২২ সালে বন্দরের চার নম্বর গেটের মুখে নির্মিত ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিসিং বিল্ডিং’-এর জন্য চারটি ‘এ’ গ্রেড লিফট সরবরাহের চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। দরপত্রে উল্লেখ ছিল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের (যেমন—ফুজিটেক, হিটাচি, মিৎসুবিশি, কোনে, ওটিস, শিন্ডলার বা থাইসেনক্রুপ) লিফট সরবরাহের শর্ত।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনে স্থাপিত লিফটগুলো ‘ফুজাও’ ব্র্যান্ডের—যার বাজারমূল্য মাত্র ১২ থেকে ১৮ লাখ টাকা। এই নিম্নমানের লিফট সরবরাহ করে ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রায় চার কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে বন্দর হাসপাতাল সংলগ্ন অফিসার্স কোয়ার্টার, অফিসার্স ডরমিটরি, স্টোর ভবন, কার শেড এবং প্রশাসনিক ভবনের প্রকল্পগুলোতেও।

সিন্ডিকেটের কারসাজি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্দর বিদ্যুৎ বিভাগের এই দুর্নীতির সঙ্গে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জড়িত—এ অ্যান্ড জে ইন্টারন্যাশনাল, ম্যাক্সওয়েল সিমেন্স পাওয়ার প্লাস, এবিএম ওয়াটার কোম্পানি ও গ্রিন ডট। মালিকরা মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. শাখাওয়াত হোসেন এবং আতাউল করিম সেলিম বন্দরের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখন বন্দরে টেন্ডার মানে প্যাকেজ সিস্টেম। আগে থেকেই ঠিক করা থাকে কে কাজ পাবে, বাকিরা শুধু নামমাত্র দরপত্র দেয়।”

প্রকৌশলীদের সতর্কবার্তা

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তিনজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ‘এ’ গ্রেড লিফট হলে তা অবশ্যই ইউরোপ বা জাপানের মানসম্পন্ন পণ্য হতে হবে। কিন্তু বন্দরে স্থাপিত লিফটগুলো দূর থেকেই বোঝা যায়, সেগুলো নিম্নমানের চীনা পণ্য। এ ধরনের লিফটে নিরাপত্তা, কন্ট্রোল ইউনিট, গিয়ারলেস মোটর কিংবা কার্বন-স্টিল রোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নেই, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এভাবে ‘এ’ গ্রেডের নামে নিম্নমানের লিফট সরবরাহ শুধু অর্থ নয়, জননিরাপত্তার সঙ্গেও প্রতারণা। দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা।”

তিনি আরও বলেন, “এটি কোনো একক ঘটনা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির স্পষ্ট উদাহরণ।”

বন্দরের প্রতিক্রিয়া

ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “কোন লিফট সরবরাহ করা হয়েছে, সেটা প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন।” এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের পরিচালক এসএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “আপনারা সরেজমিনে দেখে প্রতিবেদন লিখুন।”

বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ভয়াবহ দুর্নীতির অংশ। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”

সূত্র: আমার দেশ

error: Content is protected !!