‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোটের প্রস্তাব : সংবিধান বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

আতাউর রহমান | শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও সমাজচিন্তক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

আতাউর রহমান :

গণতন্ত্রে জনমত যাচাইয়ের অন্যতম পদ্ধতি গণভোট আবারও আলোচনায় এসেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করতে তারা গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব করছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের দিনই আলাদা ব্যালটে ভোটাররা জানাবেন—তারা সনদটির পক্ষে না বিপক্ষে।

তবে এই প্রস্তাব ঘিরে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কেউ একে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, এটি আইনি কাঠামোহীন ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর উদ্যোগ।

সংবিধানের সীমাবদ্ধতা ও আইনগত অনিশ্চয়তা

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করে দেয়। ফলে দেশে বর্তমানে গণভোট আয়োজনের কোনো কার্যকর আইন নেই। এই অবস্থায় কমিশনের প্রস্তাব সংবিধানসম্মত কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন,

“জুলাই সনদের মতো একটি বহুপাতার নথি পড়ে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ সিদ্ধান্ত দেবে—এটা অবাস্তব। ডকুমেন্টের ওপর গণভোট হয় না। বিষয়টি আইনগতভাবে দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর।”

তার মতে, গণভোটের নামে রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণের এক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে—যেখানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত নেবে কেবল কিছু ব্যক্তি।

জনগণের সার্বভৌম মতপ্রকাশ : পাল্টা মতামত

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মনে করেন,

“গণভোট মানেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অভিব্যক্তি। সংবিধান গ্রহণের ক্ষেত্রেও গণভোট হয়েছিল, তাহলে জুলাই সনদের বিষয়ে কেন নয়?”

তার মতে, এটি সংবিধান সংশোধনের গণভোট নয়, বরং জনমতের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ নির্বাচনের আগেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হলে জনগণের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাবে বলে তিনি মনে করেন।

ইতিহাসে তিনটি গণভোট : প্রেক্ষাপটের পুনরাবৃত্তি?

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রথমটি ১৯৭৭ সালে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনের বৈধতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে; ফলাফল ছিল ৯৮.৮০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’।
দ্বিতীয়টি ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারের সমর্থন যাচাইয়ের জন্য; ফলাফল ৯৪.১৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’।
তৃতীয়টি ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সাংবিধানিক গণভোট; ফলাফল ৮৪.৩৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’।

এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে কোনো গণভোট ছাড়াই। ফলে বর্তমান উদ্যোগটি রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় উন্মোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা : গণভোট নয়, প্রয়োজন গণআলোচনা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনগণের মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিষ্কার আইন, তথ্যপ্রবাহ ও সচেতনতা ছাড়া গণভোট বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, প্রথমে প্রয়োজন গণআলোচনা ও নীতিগত ঐকমত্য—তারপর গণভোটের মতো জটিল প্রক্রিয়ায় যাওয়া যেতে পারে।

একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন,

“গণভোটের আগে জনগণকে বিষয়টি বুঝিয়ে তোলা জরুরি। নয়তো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট গণতন্ত্র নয়, বরং রাজনীতির অভিনয় হয়ে উঠবে।”

গণতন্ত্রের পরীক্ষা, না কি নতুন বিভাজন?

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পথে গণভোট হতে পারে গণতন্ত্রের অংশগ্রহণমূলক পরীক্ষা, আবার এটি হয়ে উঠতে পারে রাজনীতির নতুন বিভাজনের ক্ষেত্র।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—জনগণের মতামত কি সত্যিই প্রতিফলিত হবে, নাকি আবারও এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই ব্যবহৃত হবে?

ফিচার মন্তব্য:

গণভোট গণতন্ত্রের অন্যতম প্রাণশক্তি—যদি তা হয় আইনসম্মত, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ। জনগণের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক, তবে জনগণকে না বোঝিয়ে, আইনি কাঠামো তৈরি না করে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে গণভোট আয়োজন করা মানে জনমত নয়, বরং রাজনৈতিক পরীক্ষার মাঠ তৈরি করা।

জনগণকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর সরল রায় দিতে বলার আগে প্রয়োজন তথ্যপ্রাপ্তি, সচেতনতা ও আস্থার পরিবেশ। গণভোট হোক গণতন্ত্রের উজ্জ্বল প্রকাশ—রাজনীতির অলঙ্কার নয়।

error: Content is protected !!