দুর্নীতিতে জর্জরিত এনবিআর: একের পর এক কেলেঙ্কারিতে রাজস্ব বোর্ড

দেশ এডিশন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগ যেন থামছেই না। একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় দেশের রাজস্ব আদায়ের এই প্রধান সংস্থাটি এখন তীব্র ভাবমূর্তি সংকটে।

দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এনবিআর। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ফাঁস, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের অভিযোগে ধরা পড়ছেন।

ঘুষের টাকায় হাতে নাতে ধরা পড়া থেকে শুরু করে আয়কর নথি বিক্রি, ট্রাফিক পুলিশকে গালিগালাজ—সব মিলিয়ে এনবিআর এখন যেন বিতর্কের আরেক নাম। প্রায় দেড়শ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তাধীন।

এ বছরের এপ্রিলে এনবিআর বিলুপ্ত করে “রাজস্ব নীতি” ও “রাজস্ব ব্যবস্থাপনা” নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারির পর থেকেই সংস্থাটির ভেতরে দেখা দেয় ব্যাপক অস্থিরতা। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মকর্তারা ধর্মঘট, কলম বিরতি ও কর্মবিরতির মতো আন্দোলন চালান। গুরুত্বপূর্ণ বাজেট প্রণয়নকালেও অচলাবস্থা তৈরি হয় এনবিআরের কাজকর্মে।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ সময়ে আলোচিত “ছাগলকাণ্ডের” নায়ক মতিউর রহমান ছিলেন এনবিআরের কর্মকর্তা। অবৈধভাবে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিনি ও তার স্ত্রী বর্তমানে দুদকের মামলায় কারাগারে।

সম্প্রতি একই ধরনের অভিযোগে আলোচনায় আসেন এনবিআর সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরী। প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পরে তাকে ওএসডি করা হয়।

বেলালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের নামও ঘুরে বেড়াচ্ছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। বেলালের অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে শুরু করে বিদেশযাত্রার অনুমোদনবিহীন কার্যক্রমে চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ দেখা যায়।

অন্যদিকে, ‘সহযোগী নিয়োগের’ মাধ্যমে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার এবং তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। একই মাসে সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু চাকরি হারান ৩৮ লাখ টাকায় কর নথি বিক্রির অভিযোগে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসেও ধরা পড়েন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রাজীব রায়, ঘুষের ৩০ হাজার টাকা হাতে নিয়ে।

শুধু দুর্নীতি নয়, অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে। সহকারী কর কমিশনার ফাতেমা বেগম ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে অশালীন আচরণের দায়ে চাকরি হারিয়েছেন।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে এনবিআরের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এনবিআরের এক কমিশনার স্বীকার করেছেন—“অধিকাংশ কর্মকর্তা আর্থিক অনিয়মে জড়িত। টাকা ছাড়া কেউ কাজ করতে চায় না। কেউ ধরা পড়ছে, কেউ পড়ছে না—এই পার্থক্যটুকুই আছে।”

তবে কিছু কর্মকর্তা এখনো আশাবাদী। তারা মনে করেন, অনলাইনভিত্তিক সেবা ও ডিজিটাল পদ্ধতির প্রসারে দুর্নীতি কমবে। ইতোমধ্যে ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, অনলাইন অডিট ও ভ্যাট রিফান্ডও চালু হচ্ছে।

এনবিআরের এক সদস্য বলেন,

“কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে পুরো সংস্থার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তবে এখানেও অনেক সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা আছেন।”

এক সময় দেশের রাজস্ব সংগ্রহের মূল স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এনবিআর এখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটিকে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল কিছু পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।

✍️ প্রতিবেদন: দেশ এডিশন নিউজ ডেস্ক

error: Content is protected !!