✍️ দেশ এডিশন ডেস্ক প্রতিবেদন :
বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা। শিশু থেকে বৃদ্ধ— কেউই রেহাই পাচ্ছেন না এই ভয়াবহ অপরাধের ছোবল থেকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ধর্ষণ বিষয়ক একটি বিস্তৃত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা সমাজে নৈতিকতা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটকে উন্মোচন করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ধর্ষণকারীরাই ভুক্তভোগীর পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন বা নিকট প্রতিবেশী। অর্থাৎ, আস্থার সম্পর্ককেই অনেক অপরাধী ব্যবহার করছে শারীরিক নির্যাতনের অস্ত্র হিসেবে। পিবিআই ধর্ষণকে ‘নৈতিকতা বিবর্জিত সামাজিক ব্যাধি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পরিসংখ্যান যা কাঁপায় বিবেক
পিবিআইয়ের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫০,৫৮৬ জন নারী ও শিশু, এর মধ্যে ৩,৬১১ জন গণধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩২১ জনের। একই সময়ে ১৯,২৩৪ জন নারী ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন।
এই সময়ে দেশে ৭৩,৬৫২টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ১,১৭,০০২ জন। গ্রেফতার হয়েছে ৬৭,৩৯৭ জন, এবং অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে ৬১,৮৪০টি মামলায়।
শিশু ও শিক্ষার্থী সবচেয়ে ঝুঁকিতে
গবেষণায় বলা হয়, ভুক্তভোগীদের ৭২.৬১ শতাংশই শিশু ও শিক্ষার্থী, আর অভিযুক্তদের ২০.২৩ শতাংশ মাদকাসক্ত ও ২৭.৩৮ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। এদের অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের সন্তান।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ, ২৯ জন প্রতিবন্ধী শিশু, এবং ধর্ষণের পর ১৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে— ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। এ সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছে ৭২৫ জন শিশু, যার মধ্যে ১০২ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে।
ধর্ষণের পেছনের কারণ
পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে ধর্ষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে—
▪অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও নিয়ন্ত্রণহীন যৌনচাহিদা
▪মাদকাসক্তি ও পর্নোচিত্রে আসক্তি
▪পারিবারিক শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় অনুশাসনের অবহেলা
▪বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও শাস্তিহীনতা
▪প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়ার নোংরা প্রভাব
এছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদ্রাসা, ছাত্রাবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, যেখানে শিক্ষকরা কখনও প্রলোভন, কখনও হুমকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতনে বাধ্য করছে।
বিশেষজ্ঞ মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন,
“সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ধর্ষণকাণ্ডে বড় ভূমিকা রাখছে। পরিবার ও সমাজকে এখনই সচেতন হতে হবে।”
পিবিআই প্রধানের মন্তব্য
পিবিআই প্রধান, পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন,
“ধর্ষণ একটি সামাজিক সমস্যা। শুধু আইন বা শাস্তি দিয়েই সমাধান হবে না। নারীকে আলাদা করে রাখা নয়, বরং সমাজে ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনাই এখন জরুরি। রাষ্ট্রকে সেই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
সংখ্যায় ধর্ষণ চিত্র: ভয়াবহ বাস্তবতা
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়— এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫০ হাজার ৫৮৬ জন নারী ও শিশু, যার মধ্যে ৩ হাজার ৬১১ জন গণধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের কারণে ৩২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৯ হাজার ২৩৪ জন নারী ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। গত দশ বছরে ৭৩ হাজার ৬৫২টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা দায়ের হয়, যেখানে আসামির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ২ জন। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ৬৭ হাজার ৩৯৭ জন, আর অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয় ৬১ হাজার ৮৪০টি মামলায়।
পিবিআই কর্তৃক বিশ্লেষিত ৮৪টি আলোচিত মামলার তথ্যে উঠে এসেছে— ভুক্তভোগীদের ৭২ দশমিক ৬১ শতাংশই শিশু ও শিক্ষার্থী। ধর্ষকদের মধ্যে ২০ দশমিক ২৩ শতাংশ মাদকাসক্ত এবং ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। অধিকাংশ ভুক্তভোগী দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং অধিকাংশ ধর্ষক ভুক্তভোগীর পরিচিতজন বা নিকটাত্মীয়।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন প্রতিবন্ধী শিশু এবং ১৫ জন ধর্ষণের পর হত্যা ও ৫ জন আত্মহত্যা করেছে।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে ৭২৫ জন শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ১৩৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০২ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে, ২১৭ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে, ২০৮ জন ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী, এবং ১৯৮ জনের বয়স অজানা। এসব ঘটনার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩৬টি ঘটনায়।
সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে— বাংলাদেশে ধর্ষণ এখন কেবল আইন-শৃঙ্খলার নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদন শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়— এটি বাংলাদেশের সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক দুর্বলতা, বিচারহীনতা এবং মানবিক শূন্যতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ, শিক্ষায় মানবিকতা ও পরিবারে মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।