বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক: নতুন অধ্যায় নাকি পুরোনো সংশয়?

দেশ এডিশন | আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ডেস্ক:
প্রকাশ: ১৩ ঘন্টা আগে

বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে এগোবে—এ প্রশ্নই এখন কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও ভবিষ্যতমুখী।

বাংলায় প্রকাশিত এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে অভিনন্দন জানিয়ে ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

অবিশ্বাসের অতীত, বাস্তবতার বর্তমান
২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার পতন এবং তার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে। সীমান্ত হত্যা, পানি বিরোধ, বাণিজ্যগত নিষেধাজ্ঞা ও উসকানিমূলক বক্তব্য—এসব পুরোনো অভিযোগ আবার সামনে আসে। ফলস্বরূপ ভিসা পরিষেবা, ট্রেন–বাস ও বিমান চলাচল স্থগিত থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য প্রশ্ন আর “সম্পর্ক থাকবে কি না”—তা নয়; বরং কীভাবে সম্পর্ক রাখা হবে সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ দমন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিতর্ক থেকে দূরে রাখার বিষয়গুলো সংবেদনশীল।

পুরোনো অভিজ্ঞতা, নতুন বাস্তবতা
২০০১ সালে খালেদা জিয়া-এর নেতৃত্বে বিএনপি–জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। সে সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন অভিযোগ ও চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো ঘটনা আস্থার সংকট বাড়ায়। এমন প্রেক্ষাপটেই পরবর্তীতে দিল্লি শেখ হাসিনার সরকারের ওপর বড় বিনিয়োগ করে। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ভারতের নিরাপত্তা ও সংযোগ–স্বার্থে সহযোগিতা জোরদার করেন। তবে ২০২৪ সালের ঘটনার পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও তার প্রত্যর্পণ ইস্যু সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংকেত ও বার্তা সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—যাকে কূটনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের ঘোষণা—“দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়; সবকিছুর আগে বাংলাদেশ”—আঞ্চলিক ভারসাম্যের বার্তা দেয়।

পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও দিল্লির দুশ্চিন্তা
হাসিনার পতনের পর ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। সরাসরি ঢাকা–করাচি ফ্লাইট পুনরায় চালু, কূটনৈতিক সফর ও বাণিজ্য বৃদ্ধির তথ্য সামনে এসেছে। দিল্লিভিত্তিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সম্পর্কের পেন্ডুলাম যেন এক দিক থেকে অন্য দিকে অতিরিক্ত না দুলে—এটাই ভারতের উদ্বেগ।

নিরাপত্তা সহযোগিতা: স্থিতিশীলতার ভিত্তি
সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি। যৌথ সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনায় ভারতের ৫০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট—এসব চলমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিএনপি এ সহযোগিতা থেকে সরে আসবে না।

ভূগোল ও অর্থনীতি: বিচ্ছিন্নতা অসম্ভব
৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বাণিজ্য—এসব বাস্তবতা ঢাকা ও নয়াদিল্লিকে একে অপরের সঙ্গে আবদ্ধ করে রেখেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার, আর ভারত বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার।

নতুন শুরু কার হাত ধরে?
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব—তবে দরকার সংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাস্তববাদী কূটনীতি। বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব ভারতের, আর অতীতের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ বিএনপির।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই—নতুন বাস্তবতায় প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে? ঢাকা ও নয়াদিল্লির পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।

error: Content is protected !!