দেশ এডিশন ডেস্ক :
শাপলা প্রতীককে ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, জাতীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা কোনো রাজনৈতিক দলকে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়; অন্যদিকে এনসিপি দাবি করছে, কমিশনের এই সিদ্ধান্ত আইনগত ভিত্তিহীন ও পক্ষপাতদুষ্ট।
● কমিশনের অবস্থান
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন স্পষ্ট করে জানান, শাপলা প্রতীক কোনো রাজনৈতিক দলকে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কোনো দল বা ব্যক্তির চিঠি বা প্রভাবে এটি পরিবর্তন হবে না। নাগরিক ঐক্যকেও শাপলা প্রতীক দেওয়া হয়নি, অথচ তাদের বিষয়ে এত প্রশ্ন ওঠেনি। তাহলে এনসিপিকে ঘিরে এত প্রশ্ন কেন?”
সিইসি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের আগে সমঝোতা হবে বলে আশা করছে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
● এনসিপির অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে “আইনগত ভিত্তিহীন ও স্বেচ্ছাচারী” আখ্যা দিয়েছে। শুক্রবার (৩ অক্টোবর) দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের বরাত দিয়ে এনসিপি জানায়, তারা নিয়ম মেনে নিবন্ধনের আবেদন ও শাপলা প্রতীক বরাদ্দের আবেদন করেছিল।
এনসিপি বলছে, ৪ জুন কমিশনের এক বৈঠকে তাদের জানানো হয়েছিল, শাপলা প্রতীক চূড়ান্ত তালিকায় আছে। কিন্তু পরে হঠাৎ করেই কমিশন জানায়, শাপলা জাতীয় প্রতীকের অংশ হওয়ায় এটি কোনো রাজনৈতিক দলকে বরাদ্দ দেওয়া যাবে না।
দলের যুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের জাতীয় প্রতীক বিষয়ক আইনে এককভাবে শাপলাকে জাতীয় প্রতীক বলা হয়নি; বরং শাপলা, ধানের শীষ, পাটপাতা ও তারার সম্মিলিত রূপই জাতীয় প্রতীক। অথচ কমিশন ধানের শীষ বিএনপিকে, তারা প্রতীক জেএসডিকে এবং কাঁঠাল প্রতীক বিজেপিকে বরাদ্দ দিয়েছে। তাহলে শুধু শাপলাকে বাদ দেওয়া পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করছে এনসিপি।
দলটি পরে বিকল্প হিসেবে সাদা শাপলা বা লাল শাপলা প্রতীক প্রস্তাব করলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি। এনসিপি অভিযোগ করেছে, এভাবে প্রতীক না দেওয়া তাদের প্রতি বৈষম্য এবং কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
● মান্নার সমর্থন
এদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এনসিপির দাবির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লেখেন, “শাপলা প্রতীক যদি তাদের (এনসিপি) দিয়ে দেয়, কোনো মামলা করব না।”
তিনি ব্যাখ্যায় যোগ করেন, “আমাকে যদি জাতীয় প্রতীকের কারণে শাপলা না দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন আর কাউকে এটি দিতে পারে না। ওরা আমার কাছে এসেছিল। যারা জুলাই অভ্যুত্থান করেছে এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ উৎখাতের কথা বলছে, তাদের বয়স ও অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে আমি তাদের প্রতি দরদী।”
● কমিশনের সর্বশেষ চিঠি
৩০ সেপ্টেম্বর এনসিপিকে চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশন জানায়, তাদের নিবন্ধনের আবেদন প্রাথমিকভাবে গৃহীত হলেও শাপলা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এটি নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ২০০৮-এর অনুমোদিত ১১৫টি প্রতীকের তালিকায় নেই।
চিঠিতে বলা হয়, বিধি ৯(১) অনুযায়ী দলকে এখন অবশিষ্ট থাকা প্রতীক থেকে একটি বেছে নিতে হবে। কমিশন ৫০টি প্রতীকের একটি তালিকাও দিয়েছে, যেখানে রয়েছে বেগুন, বালতি, লিচু, মোরগ, মোবাইল ফোন, কলম, ঘুড়ি, হেলিকপ্টার ইত্যাদি। দলটিকে আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিতভাবে প্রতীক বেছে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শাপলা প্রতীককে কেন্দ্র করে এনসিপি ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। একদিকে কমিশন তার অবস্থানে অনড়, অন্যদিকে এনসিপি ও কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রতীক বরাদ্দের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এখন দেখার বিষয়, কমিশন কি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, নাকি এনসিপির বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনায় নেয়।