আনোয়ারায় দাঁড়িয়ে আছে তিন শতকের ঐতিহ্য—ছুরুত বিবি মসজিদ

‎রুপন দত্ত | আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ছুরুত বিবি মসজিদ। মোগল আমলের এই স্থাপনাটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও পরিচিত।

মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক তথ্য। মসজিদের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে রয়েছে দুটি বৃহৎ দীঘি—দক্ষিণে “ছুরুত বিবির দীঘি” এবং পশ্চিমে “আমীর খাঁর দীঘি” নামে পরিচিত। এছাড়া আমীর খাঁর দীঘির দক্ষিণে “শেখ রাজার বসতভিটা” নামে একটি প্রাচীন বসতির অস্তিত্ব রয়েছে, যা এলাকার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে ১৫৭৫ সালের দিকে গৌড়রাজ্য ত্যাগ করে সেনাপতি শেখ মোহাম্মদ আদম গৌড়ী এই এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তার বংশধরদের মধ্য থেকে শেখ আমীর মুহাম্মদ চৌধুরী জমিদারি দায়িত্বে আসীন হন। ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, আরাকান রাজসভার প্রখ্যাত কবি আলাওল-এর দ্বিতীয় কন্যা ছুরুত বিবির সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

ধারণা করা হয়, স্ত্রী ছুরুত বিবির নামেই মোগল শাসনামলে (১৭১৩-১৭১৮ সালের মধ্যে) এই মসজিদ নির্মাণ করেন আমীর মুহাম্মদ চৌধুরী। মসজিদটি সেই সময়কার স্থাপত্যশৈলীর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।

মসজিদের বর্তমান মোতাওয়াল্লি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেম জানান, তাদের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মসজিদের দায়িত্ব পালন করে আসছে। তিনি বলেন, “আমার পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতায় আমি বর্তমানে পঞ্চম মোতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ১৯৮৮ সালে আমার পিতার মৃত্যুর পর এই দায়িত্ব গ্রহণ করি।”

তিনি আরও জানান, একসময় এই মসজিদে শুধু জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করা হতো। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল—এখানে নাকি জিনেরা নামাজ পড়ত, ফলে সন্ধ্যার পর মানুষজন ভয়ে এখানে আসত না। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকে মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শুরু হয় এবং এখন এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মসজিদের দক্ষিণ পাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে ১২টি কবর, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা কৌতূহল রয়েছে। জানা যায়, ছুরুত বিবির সংসারে জন্ম নেওয়া দুই পুত্র জাফর খাঁ ও মুজাফফর খাঁসহ দেওয়ান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই কবরগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও লোককাহিনির মিশেলে ছুরুত বিবি মসজিদ আজও স্থানীয়দের কাছে এক গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে রয়েছে। এটি সংরক্ষণ ও পর্যটন সম্ভাবনার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

error: Content is protected !!