দীর্ঘ দুই দশক ধরে পরিচালিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করতে যাচ্ছে সরকার। বিগত সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর বদলে ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস (পিপিএফ)’ নামে পুলিশের একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হবে। এ ব্যাপারে একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা) শেষে এটি অনুমোদনের জন্য শিগগির মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৮ মে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্তির ইঙ্গিত দিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে আগামী দিনে একটি আধুনিক ও পেশাদার elite force গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।’
প্রস্তাবিত পিপিএফ আইনের খসড়া ও নেতৃত্ব
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত আইনের শিরোনাম রাখা হয়েছে— ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস আইন-২০২৬’। এর খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে সুসংহত করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এমন পদক্ষেপ। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য, বেআইনি অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।
এই বিশেষায়িত সংস্থাটি গঠিত হবে র্যাবের মতোই সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে। এর একজন মহাপরিচালক (ডিজি) থাকবেন, যিনি অবশ্যই পুলিশের একজন কর্মকর্তা হবেন। তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নিয়ন্ত্রণে থেকে সরকারের আদেশ অনুযায়ী বাহিনীর সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ বাহিনীর কেউ অপরাধ করলে তার মূল সংস্থার সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন।
আইনি ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা
খসড়ায় বলা হয়, এ বাহিনীর কর্মকর্তাদের তল্লাশি, আটক ও গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে থানার একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সমান ক্ষমতা থাকবে। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা কোনো বস্তু জব্দ করলে তা যত দ্রুত সম্ভব কাছের থানায় পাঠানো এবং এ-সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পিপিএফ আইনে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।
নতুন বাহিনীর কার্যপরিধিতে মূলত আটটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো— দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বেআইনি অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন। এ ছাড়া ১৭টি যৌক্তিক কারণে পিপিএফের কোনো সদস্যকে আটক করা যাবে এবং দ্রুত তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। খসড়া অনুযায়ী, র্যাবের সব স্বার্থ, সম্পত্তি, দায়দেনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিপিএফের কাছে স্থানান্তরিত হবে।
যে কারণে বাতিল হচ্ছে র্যাব
মানবাধিকার ইস্যুতে গত দুই দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনায়, যেখানে র্যাবের নাম সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। সাবেক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন জানান, সংস্থাটি জনবান্ধব না হওয়ায় কমিশনের পক্ষ থেকে এটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও এই দাবি জানায়। এর আগে ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গুম কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গেই র্যাব জড়িত ছিল এবং তারা ২২-২৩টি গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ পরিচালনা করতো। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন সরকারের আমলে এই বিশেষ ইউনিটটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ কর্মকাণ্ডের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে র্যাব তাদের অতীতের কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছিল।