একক প্রার্থী নিশ্চিত করা বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ৫২ minutes ago

গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারের অধীনে প্রথম কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আভাস অনুযায়ী, বন্যা ও বর্ষা মৌসুম শেষে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। তবে এই নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের চেয়েও বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়ানো এবং প্রতিটি পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া এই স্থানীয় নির্বাচন ব্যক্তিনির্ভর ও নির্দলীয় প্রতীকে হবে। দলীয় প্রতীক না থাকায় দেশের ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির অধিক পৌরসভা, ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ঢাকার দুই সিটিসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট নেতা একই পদে দলীয় সমর্থনের আশায় জনসংযোগ ও কর্মিসভা চালিয়ে যাচ্ছেন।

উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহীর বাঘা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অন্তত পাঁচজন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বিএনপি নেতা মাঠে রয়েছেন। একইভাবে টাঙ্গাইলের কাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদ এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থীর সরব উপস্থিতি দলীয় শৃঙ্খলা ও ভোট বিভক্তি ঠেকানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্য বড় ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচনে কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু দেশের সিটি করপোরেশনগুলো। ঢাকা উত্তর সিটিতে বর্তমান দলীয় প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ছাড়াও সাবেক মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালসহ অন্তত ছয়জন নেতা দলের সমর্থনের প্রত্যাশায় রয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ইশরাক হোসেনসহ হেভিওয়েট নেতাদের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। তবে নীতিনির্ধারণী সূত্র জানাচ্ছে, সম্প্রতি দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে দলীয় যে নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মাঠ গোছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, দল শেষ পর্যন্ত তাদেরই মেয়র প্রার্থী হিসেবে বেছে নিতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও সাংগঠনিক সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন দুই মাসের মধ্যে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় দলটি। উপজেলা ও পৌর ইউনিটের মতামত, জেলা নেতাদের পরামর্শ এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিজস্ব খোঁজ-খবরের ভিত্তিতে একটি তালিকা দলের হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে মূলত তিনটি প্রধান মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা।
২. সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা।
৩. বিগত দিনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত জানান, বিএনপি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় শুরুতে অনেকের আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক হলেও নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, অভ্যন্তরীণ সমঝোতার মাধ্যমে অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। ফলে একক প্রার্থী নির্ধারণে বড় কোনো সংকট তৈরি হবে না বলে তারা আশাবাদী।

এদিকে জাতীয় রাজনীতিতে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার ভিন্ন রূপ দেখা যাচ্ছে। জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এরই মধ্যে পৃথকভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ আটটিতে তাদের মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এবং এনসিপিও পাঁচটিতে তাদের দল সমর্থিত প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ত্রিমুখী ও বহুস্তরীয় এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই নিজেদের তৃণমূলকে ধরে রাখা এক বিরাট পরীক্ষা।

error: Content is protected !!