
দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে বড় ধরনের মন্থরতা ও সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান শিল্পাঞ্চলে একের পর এক বেশ কয়েকটি বড় তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যা এই খাতের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের ওপর একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর বাণিজ্যিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী মাসগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ আর্থিক ঘাটতিসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠান দুটির প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই কারখানাগুলো বন্ধ করা হয়েছে, যা সাধারণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পোশাক শিল্পের বর্তমান এই বহুমুখী সংকটের পেছনে বেশ কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডারের ঘাটতি: ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে মন্থর হয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিক বৃদ্ধি, ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার অনেক কারখানার জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি মূলধনের সংকট: কাঁচামাল আমদানির জন্য সময়মতো ঋণপত্র বা এলসি (LC) খুলতে না পারা এবং কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
ব্যয় ও সক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা: পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা তাদের স্থায়ী ব্যয়ের চাপ (যেমন- বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া, ইনক্রিমেন্ট) সামাল দিতে না পেরে টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত এপ্রিলে জানান, বিগত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের একটি বৃহৎ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিগত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে সর্বমোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত কাজের অর্ডারের অভাবে এবং ১৯০টি বন্ধ হয়েছে তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে। বাকিগুলো শ্রমিক অসন্তোষ, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি কিংবা কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শুরুতে অর্ডারের ঘাটতি থাকলেও পরবর্তীতে তা চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নেয়, যার ফলে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের এই ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা দাবি জানিয়েছেন, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাইকৃত বা কর্মহীন হওয়া শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও চাকরি-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সংলাপে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পোশাক শ্রমিকদের টিকে থাকতে হলে রি-স্কিলিং বা নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়া জরুরি।
তবে এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) একটি ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংস্থাটি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিউএফটির সাথে একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী তিন বছরে ২২ হাজার ৮১৫ জন পোশাক শ্রমিক ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাকে আধুনিক যন্ত্রপাতি চালনা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণে প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যা এই খাতের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই এই খাতের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।