চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবা গ্রুপের বৈশ্বিক বি-টু-বি প্ল্যাটফর্ম আলিবাবা ডটকম বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সোর্সিং হাব হিসেবে দেখছে। স্থানীয় ভোক্তাদের জন্য অনলাইন শপিং সেবা চালুর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে সংযুক্ত করতে কাজ করছে।
অনেক বাংলাদেশির কাছে আলিবাবা গ্রুপ আমাজন বা আলীএক্সপ্রেসের মতো একটি অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম মূলত রপ্তানিমুখী। আলিবাবা ডটকমের মাধ্যমে দেশীয় কারখানা ও সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিক পাইকারি ক্রেতা, আমদানিকারক এবং সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আলিবাবা ডটকমের মাধ্যমে বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা প্রায় এক কোটি ডলারের রপ্তানি ব্যবসা সম্পন্ন করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য।
বর্তমানে চারটি স্থানীয় চ্যানেল পার্টনারের মাধ্যমে ৩০০-এর বেশি বাংলাদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করছে আলিবাবা। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে কোনো গুদাম, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা স্থানীয় ই-কমার্স সেবা পরিচালনা করে না।
আলিবাবা ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র চ্যানেল অপারেশন স্পেশালিস্ট ওয়াং কুইলিং ভ্যানিয়া বলেন, “বাংলাদেশ মূলত আলিবাবা ডটকমের জন্য একটি কৌশলগত বৈশ্বিক সোর্সিং হাব।” তিনি জানান, ‘প্ল্যাটফর্ম-প্লাস-লোকাল-পার্টনার’ মডেলের মাধ্যমে কোম্পানিটি পরিচালিত হয়, যেখানে আলিবাবা বৈশ্বিক ক্রেতা নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে এবং স্থানীয় অংশীদাররা রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়।
স্থানীয় পার্টনারদের মধ্যে রয়েছে ট্রেডশি, মেইদাও, স্কাইটেক এবং ম্যাক্সিমো। এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা অনলাইন স্টোরফ্রন্ট তৈরি, বহুভাষিক পণ্য প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুসন্ধান গ্রহণ এবং ‘রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (RFQ)’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্ডারের জন্য বিড করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে বাংলাদেশে ভোক্তামুখী শপিং সেবা চালুর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে আলিবাবা। বরং ব্যবসায়িক সংগঠন ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করতে ঢাকায় একটি ছোট প্রতিনিধি অফিস খোলার বিষয় বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আলিবাবা ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ বিষয়ক ডোমেস্টিক চ্যানেল ম্যানেজার সোনোবার মাইরা জানান, দেশে বি-টু-বি ই-এক্সপোর্টের প্রবেশ হার ১৫ শতাংশেরও নিচে, যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামে তা ৩০ শতাংশের বেশি।
তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বিধি, পেমেন্ট অনুমোদনে বিলম্ব এবং পুরোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ১ হাজার ডলারের কম মূল্যের ছোট রপ্তানি লেনদেনে এসব জটিলতা বেশি দেখা যায়।
এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পেমেন্ট সল্যুশন চালুর লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে আলিবাবা। এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। উদ্যোগটির লক্ষ্য সীমান্ত পারাপারের লেনদেন সহজ করা এবং রপ্তানি অর্থপ্রাপ্তির সময় কমানো।
তিন বছরে ১,০০০ রপ্তানিকারককে বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত করার লক্ষ্য
সোনোবার মাইরা জানান, আগামী তিন বছরে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি রপ্তানিকারককে ডিজিটালভাবে বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় করতে চায় আলিবাবা।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব সহযোগিতার আওতায় রপ্তানিকারক প্রশিক্ষণ, অনবোর্ডিং সহায়তা এবং ক্রেতা-ম্যাচমেকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আলিবাবার মতে, বৈশ্বিক ক্রেতারা ক্রমেই সোর্সিং গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনছে এবং অনলাইন প্রোকিউরমেন্ট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। ফলে ডিজিটাল সোর্সিং প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে দ্রুত বর্ধনশীল বৈশ্বিক ডিজিটাল বাণিজ্যের পূর্ণ সুবিধা নিতে বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা আরও স্পষ্ট করা এবং রপ্তানি পেমেন্ট ব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।