চীনের এআই প্রযুক্তি থেকে শিক্ষণীয় বাংলাদেশের

—Π আতাউর রহমান
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

রাত গভীর। চীনের কুইচৌ প্রদেশের একটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে শুয়ে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ছেন ইউকুও। চোখে ঘুম নেই। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কেটেছে কয়েকটি দিন। মন পড়ে আছে বাড়ির খামারে। গবাদি পশুগুলোকে খাবার দেওয়ার কেউ নেই। এদিকে হাসপাতালের বিলটাও বেড়ে চলেছে লাগামহীন। ছেন স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, তার এমন অসুস্থতা মানেই সংসারটা আবার রাতারাতি চলে যাবে দারিদ্র্যের পাড়ায়। যে দারিদ্র্যটাকে তিনি এর আগে একবার ঝেঁটিয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন।

তবে কুইচৌ প্রদেশের এআই (AI) পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সুবাদে ছেনের এ ঘোরতর সংকটের খবর কিন্তু চলে গেছে স্থানীয় প্রশাসনের কানে। সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝে নিয়েছিল, হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে গেলে ছেনের পরিবারকে আবার পথে বসতে হবে এবং সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রামীণ কর্মকর্তারা হাসপাতালে হাজির হয়ে ছেনের পরিবারের জন্য চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি খামারে অবহেলায় পড়ে থাকা পশুগুলো বিক্রি করে নগদ অর্থের ব্যবস্থা করলেন এবং ভবিষ্যতে চলার জন্য কর্মসংস্থানের একটি টেকসই পরিকল্পনাও তৈরি করে দিলেন।

চীনের বিগ ডেটা ও এআই মডেল
চীন ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চরম দারিদ্র্য নির্মূলের ঘোষণা দেয়। কুইচৌ প্রদেশের ছেন ইউকুওর বেলায় কাজটা যেভাবে হয়েছে, তা হলো— সেখানকার জননিরাপত্তা দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি কর্তৃপক্ষের যাবতীয় তথ্যভাণ্ডারকে বিগ ডেটার (অতিকায় ডেটাবেজ) অধীনে আনা হয়েছিল আগেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই গ্রামীণ বাসিন্দার তথ্যে চোখ বুলিয়ে বুঝে নেয় কার পরিবার কী সংকটে আছে। কুইচৌতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখনই কোনো দারিদ্র্যসংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেয়, সেটার জন্য কার্যকর সহায়তা প্রদানের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ১৫ দিন। এর ফলে ২০২৫ সালের জুন নাগাদ, প্রদেশটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার মানুষকে ঝুঁকির তালিকায় চিহ্নিত করেছিল এবং দ্রুত সুনির্দিষ্ট সহায়তার মাধ্যমে তাদের প্রায় ৭৩ শতাংশেরই জীবনযাত্রা স্থিতিশীল করতে পেরেছে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও করণীয়

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমেছে সত্য। কিন্তু গ্রামীণ ও শহরের নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর অনেকে এমন এক সূক্ষ্ম সীমারেখায় বাস করছেন, যেখানে সামান্য সামাজিক বা স্বাস্থ্যগত ধাক্কা লাগলেই একটা পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতায় চীনের সাম্প্রতিক দারিদ্র্যবিরোধী মিশনের তথ্যপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতাটা শিক্ষণীয় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) আছে, আছে মোবাইল ব্যাংকিং ও বেশ কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এর সাথে দরকার শুধু এক চিলতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার আর প্রশাসনের সদিচ্ছা। চীনের কৌশলগত সহায়তায় অতিদ্রুত ‘দারিদ্র্য ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা খুব সম্ভব। সফটওয়্যার তৈরি বা ডেটা বিশ্লেষণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো বাংলাদেশে মেধারও কমতি নেই।

ধরা যাক, কোনো কৃষক পরপর দুই মৌসুমে ক্ষতির মুখে পড়েছেন; কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে আছে; কিংবা কোনো পরিবার নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বহন করতে পারছে না। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, কৃষি ভর্তুকি, উপবৃত্তি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে একজোট করলেই দেখা যাবে— হুহু করে বেরিয়ে আসবে কোন পরিবার কীসের ঝুঁকিতে আছে এবং কার পাশে সবার আগে দাঁড়ানো দরকার।

ভাতা নয়, স্থায়ী কর্মসংস্থান
চীনের অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা দারিদ্র্য বিমোচনকে শুধু ভাতা বা অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে গ্রামীণ শিল্প, কৃষি আধুনিকায়ন, ই-কমার্স এবং কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমানোর কার্যকর উপায় হলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। গ্রামে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য খাত, দুগ্ধশিল্প এবং অনলাইন বাজারব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, নগদ সহায়তা কিছুদিনের আরাম দিতে পারে, স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যমুক্তি ঘটায় না।

বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা হলেও চীনের দেখানো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও পরিবারভিত্তিক পৃথক সহায়তা পরিকল্পনা কাজে লাগানোই যায়। চীনের মতো এআই নজরদারির ব্যবস্থা থাকলে মুহূর্তেই জানা যাবে, কোনো পরিবারকে একবেলা সাহায্য করা সমাধান নয়; বরং কাকে মাছ ধরা শেখাতে হবে আর কাকে দিতে হবে নতুন খামার গড়ে তোলার পুঁজি। প্রযুক্তিকে সামাজিক সুরক্ষার হাতিয়ার বানাতে পারলে বাংলাদেশও এক নতুন দিগন্তের ছোঁয়া পাবে।

error: Content is protected !!