
বাংলাদেশ বর্তমানে এক ঐতিহাসিক ‘ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন’ বা জনসংখ্যাগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এখন কর্মক্ষম বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত। অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলা হয়। সাধারণত কোনো দেশের জন্ম ও মৃত্যুহার পরিমিত হয়ে এলে জনসংখ্যার বয়স-কাঠামোতে এই বিশেষ পরিবর্তন আসে, যা দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক অনন্য ও সীমিত সময়ের জানালা খুলে দেয়।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ধরা হয়। যখন এই কর্মক্ষম অংশটি নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর (০-১৪ বছর বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে, তখন দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, এই লভ্যাংশের সময়সীমা সীমিত এবং বর্তমানের এই বিপুল শক্তিকে যদি সঠিক পদ্ধতিতে কর্মমুখী করা না যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডেভিড ব্লুম, ডেভিড ক্যানিং ও জেপি সেভিয়ারের যৌথ গবেষণা গ্রন্থ ‘দ্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯১১ সালে এই ভূখণ্ডে প্রতি ১০০ কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৮ জন। ১৯৭১ সালের বিশেষ পরিস্থিতির পর এই হার সাময়িকভাবে বাড়লেও, পরবর্তীতে তা ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করে এবং ২০২১ সালে ৫০-এ এসে দাঁড়ায়। ২০২২ সালের পর থেকে নির্ভরশীলতার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো ‘ন্যাশনাল ট্রান্সফার অ্যাকাউন্টস’ (এনটিএ)-এর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের সামনে ২০৩৬ সালের মধ্যেই প্রথম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এরপর থেকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করবে। অন্যদিকে, বিশ্বজনসংখ্যার সম্ভাব্য প্রবণতা সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিবেদনের সংশোধিত সংস্করণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নির্ভরশীলতার সামগ্রিক হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাবে ২০৪৫ সালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বা জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন জানান, জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে হলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দ্রুত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি তাঁদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকৌশল ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, এই সুযোগের বড় একটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো যে সময়টুকু অবশিষ্ট রয়েছে, তাকে শতভাগ নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
গবেষকদের মতে, যুব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা এবং শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে প্রবীণদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়-নিরাপত্তা, আধুনিক প্রবীণনিবাস, বয়সবান্ধব পরিকাঠামো ও মানসম্মত জেরিয়াট্রিক (প্রবীণ) স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এখনই গ্রহণ করা উচিত। জনমিতিক এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে জনসংখ্যা সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।