
জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) সংরক্ষিত দেশের কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার এবং এর নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নথিপত্র সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং নির্বাচন কমিশনসহ (ইসি) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) দুদকের পক্ষ থেকে বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদক সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে দেশের ১২ কোটিরও বেশি নাগরিকের ভোটার ও পরিচয়পত্র সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য নির্বাচন কমিশনের অধীনে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে নাগরিক তথ্যের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
স্বাক্ষরিত সেই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত বা গোপনীয় তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিনিময়, হস্তান্তর কিংবা বিক্রি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
দুদকে আসা সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা গেছে, চুক্তির আওতায় প্রায় ১১ কোটি নাগরিকের তথ্যের একটি বিশেষ মিরর কপি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে (বিসিসি) হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী চুক্তির সেই মূল শর্তসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ না করে ‘ডিজিকন গ্লোবাল সার্ভিস লিমিটেড’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। পরবর্তীতে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের প্রায় ৪৬ ধরনের ব্যক্তিগত ও জনমিতিক তথ্য দেশ-বিদেশের অন্তত ১৮২টি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সরবরাহ বা বিনিময় করা হয় বলে অভিযোগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিনিময়ের নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও আইনি বৈধতা যাচাই করতেই মূলত এবার নথিপত্র তলব করে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। উল্লেখ্য, এই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণের বিষয়ে ইতিপূর্বে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছে, এই তথ্য হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সাবেক সরকারের উক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আইনি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
এর আগে বিগত সরকারের আমলে ভোটার তথ্যভান্ডার বা এনআইডি উইংটি নির্বাচন কমিশনের অধীন থেকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন করার একটি প্রশাসনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইন সংশোধনীর কাজও আংশিকভাবে সম্পন্ন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই পরিকল্পনাটি আর চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। দেশের নাগরিকদের আইডেন্টিটি ও তথ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দুদক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।