চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সংগ্রামী নারীদের মধ্যে অনুপ্রেরণার এক নাম বিজলী দাশ। জীবনের প্রতিটি ধাপে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সামাজিক কটূক্তি ও কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তিন কন্যাকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এ গল্প এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার প্রতীক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত চরতি গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম বিজলী দাশের। শৈশব থেকেই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। সে সময় গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত ধারণার কারণে অল্প বয়সেই তাকে আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন গ্রামে বিয়ে দেওয়া হয়।
বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও থেমে থাকেননি বিজলী দাশ। সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেও রাত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সংসারের কাজ শেষ করে গভীর রাতে বই নিয়ে বসতেন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে সংসারের চাপ ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এরপর আর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি।
নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, সন্তানদের শিক্ষার মাধ্যমে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবেন। পরপর তিন কন্যাসন্তানের জন্মের পর সমাজের নানা কটূক্তি ও অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। “ছেলে হয়নি” এমন মন্তব্য শুনেও ভেঙে পড়েননি তিনি। এ সময় তার স্বামী ছিলেন সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রধান শক্তি।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় স্বামীর মৃত্যুর পর। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে তিন ছোট মেয়েকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাননি; এমনকি সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করা হয় তাকে।
তবুও হার মানেননি বিজলী দাশ। দিন-রাত পরিশ্রম করে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে বই, কোচিং ও শিক্ষার যাবতীয় খরচ বহন করেছেন। একজন মায়ের পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সাহসের প্রতীক।
বর্তমানে তার তিন কন্যাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে লিনা দাশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে বারখাইনের পদ্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।
দ্বিতীয় কন্যা কলি দাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন।
ছোট মেয়ে লিপি দাশ সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রামের গণিত বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।
সংগ্রামী এই মা বিজলী দাশ বলেন, “একজন মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সন্তানদের মানুষ করে তোলা। জীবনের কষ্ট ও অপূর্ণতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেই আমি মেয়েদের জন্য আলোর পথ তৈরি করেছি। সুযোগ পেলে মেয়েরাও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গর্ব বয়ে আনতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননা পাওয়াকে তিনি জীবনের বড় অর্জন মনে করেন।