নিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিকায়নে নতুন প্রশাসনিক পরিকল্পনা

বিশেষ নগর প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

রাজধানী ঢাকার পরিবেশগত স্থায়িত্ব রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ এবং আধুনিক নিষ্কাশন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশদ আঞ্চলিক পরিকল্পনায় (ড্যাপ) চিহ্নিত স্থায়ী জলাধারসমূহ বা ‘ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’ দ্রুত সংরক্ষণের জোর তাগিদ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিক্রমার নিরিখে শহরের উন্মুক্ত স্থান ও সলিড মাটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অংশীজনেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবগঠামো নিশ্চিত করতে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋতুভিত্তিক বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কিছুটা পরিবর্তিত হলেও সুনির্দিষ্ট সময়ে বর্ষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার জন্য প্রথাগত সংযোগপথের পাশাপাশি বড় আকারের প্রাকৃতিক আধারের উপস্থিতি অপরিহার্য।

নগরীর সার্বিক পরিকাঠামো প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, কিছু সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে বৃষ্টির পানি অপসারণে সময়ের তারতম্য ঘটছে, কারণ ভূগর্ভস্থ লেয়ারে পানি প্রবেশ করার মতো সলিড মাটির পরিমাণ পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও গতিশীল করতে সিটি করপোরেশন সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, যার আওতায় নতুন রিটেনশন পয়েন্ট, আউটলেট পয়েন্ট এবং আধুনিক স্লুইসগেট নির্মাণের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ এই প্রসেসের কারিগরি দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, কেবল সংযোগপথ বা ড্রেনেজ লাইন তৈরি করলেই হবে না, বরং বিপুল পরিমাণ পানি ধারণের জন্য ১৯৯৫ সালের কৌশলগত পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) অনুযায়ী চিহ্নিত ৫টি ওয়াটার রিটেনশন পন্ড দ্রুত রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহারের উপযোগী রাখতে হবে। পানি ধারণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিষ্কাশনের গতিশীলতা বৃদ্ধি—এই দ্বিমুখী কৌশলের মাধ্যমেই কেবল ঢাকাকে একটি আধুনিক বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, বিশদ আঞ্চলিক পরিকল্পনায় কল্যাণপুর, গোড়ান চটবাড়ি, নাসিরাবাদ, বেরাইদ ও উত্তরখানে বৃহৎ এলাকাজুড়ে স্থায়ী জলাধার সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে। এই নির্ধারিত স্থানগুলো কেবল পানি ধারণের কাজই করবে না, বরং শহরের অতিরিক্ত তাপ শোষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে পরিবেশগত বাফার জোন হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

কল্যাণপুরের গৈদারটেক এলাকায় ইতিপূর্বে ওয়াসা কর্তৃক ৫৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, যা মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও ধানমন্ডি অঞ্চলের পানি অপসারণে পাম্পিং স্টেশন হিসেবে কাজ করছে। সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (এসএএফ) সহসভাপতি স্থপতি ইকবাল হাবিবও এই গণপরিসর ও জলাধারগুলোর আইনি সুরক্ষায় নাগরিক সচেতনতা ও কঠোর প্রশাসনিক তদারকির আহ্বান জানিয়েছেন। গোড়ান চটবাড়ি, নাসিরাবাদ ও উত্তরখানের নির্ধারিত জোনসমূহকে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে ফিরিয়ে এনে একটি আধুনিক ‘গ্রীন অ্যান্ড ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকা মেগাসিটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

error: Content is protected !!