বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে? আলোচনায় তিন শীর্ষ নেতা

আবু সাইদ:
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের পর এই পদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা এখন বেশ জোরালো। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন ও দলীয় পরিসরে প্রশ্ন উঠেছে—বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে কাকে দেখা যেতে পারে?

বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনা ঘেঁটে জানা গেছে, সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আপাতত তিন নেতার নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন—দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

দলটির জাতীয় কাউন্সিলের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও চলতি বছরের ডিসেম্বরকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন, পুনর্গঠন এবং সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ চলছে।

প্রায় এক দশক পর হতে যাওয়া এই কাউন্সিল ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শীর্ষ নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা।

দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, আলোচনায় থাকা তিন নেতারই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এবং দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছেও তারা গ্রহণযোগ্য—এমন ধারণা রয়েছে দলীয় অন্দরে।

বর্তমান সরকারে এই তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন রয়েছেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা-শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। আর রুহুল কবির রিজভী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে বলে দলীয় মহলে আলোচনা রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাকে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে বিএনপির ভেতরে একজন কার্যকর সংগঠক হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় তার ভূমিকা নিয়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত সহায়তায় দীর্ঘদিন যুক্ত থাকায় জিয়া পরিবারের আস্থার জায়গাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির ত্যাগী ও মাঠকেন্দ্রিক নেতা হিসেবে দেখেন অনেক নেতাকর্মী। আন্দোলন-সংগ্রামে ধারাবাহিক উপস্থিতি, মামলা-হামলার মধ্যেও সক্রিয় ভূমিকা এবং দুঃসময়ে দলীয় অবস্থান ধরে রাখার কারণে তৃণমূলের একটি বড় অংশের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই তিনজনের বাইরে অন্য কোনো নামও সামনে আসতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না দলীয় নেতারা।

বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে তা দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়। ওই কাউন্সিলেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের সপ্তম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান।

এর আগে ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে স্থায়ীভাবে এই পদে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের মহাসচিব হিসেবে পুরো সময়কালই বিএনপির জন্য ছিল কঠিন ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। একদিকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থান—এই বাস্তবতায় দেশের ভেতরে দলীয় রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, আসন্ন কাউন্সিলের পর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। বয়স, শারীরিক ক্লান্তি এবং স্বাস্থ্যগত কারণের কথা উল্লেখ করে তিনি অবসরের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন বলে দলীয় মহলে আলোচনা রয়েছে।

এদিকে দলীয় অঙ্গনে আরেকটি আলোচনাও জোরালো হয়েছে—দায়িত্ব ছাড়ার পর মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখা যেতে পারে কি না। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত বা অবস্থান এখনো জানা যায়নি।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতজন নেতা দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর পর্যায়ক্রমে দায়িত্বে আসেন মোস্তাফিজুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুস সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির নেতারা বলছেন, জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে এখন সংগঠন গোছানোর কাজ চলছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন এবং আংশিক কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও কাউন্সিল প্রসঙ্গে বলেছেন, উপযুক্ত সময়েই দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। তার ভাষ্য, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার সময় এসেছে এবং নতুন-পুরোনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে কার্যকর একটি কাউন্সিল আয়োজনের চেষ্টা থাকবে।

তবে মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসবে কি না—এই প্রশ্নে দলীয় নেতারা এখনই স্পষ্ট কিছু বলছেন না। তাদের মতে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও চেয়ারম্যান। ফলে বিএনপির অষ্টম মহাসচিব কে হচ্ছেন, সেই উত্তর পেতে এখন নজর রাখতে হবে আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের দিকেই।

error: Content is protected !!