ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল মূলধন মানুষের বিশ্বাস

Π আতাউর রহমান:
প্রকাশ: ১৪ minutes ago

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি ব্যাংকের শাখায় গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি, সীমিত পরিমাণে অর্থ উত্তোলন এবং নগদ প্রবাহের কিছু চিত্র জনমনে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে আমানতকারীদের সাময়িক উৎকণ্ঠা এখন অর্থনীতিবিদদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার পেছনের মূল অর্থনৈতিক বাস্তবতা কী? বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কথা হয় দীর্ঘদিন ব্যাংকিং পেশায় দায়িত্ব পালন করা একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারের সাথে। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। কারণ ব্যাংক মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; সেই আস্থায় সাময়িক ফাটল ধরলেই ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।”

ব্যাংকিংয়ের একটি মৌলিক সত্য হলো— কোনো ব্যাংকই গ্রাহকদের জমা রাখা শতভাগ অর্থ একসাথে নগদ হিসেবে ভল্টে সংরক্ষণ করে না। বিশ্বের সব দেশেই ব্যাংকগুলো জমাকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষণ করে এবং বাকি অর্থ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একই সময়ে বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজেদের সব অর্থ তুলে নিতে চান। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে বলা হয় “ব্যাংক রান” (Bank Run)। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এমন পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত অর্থনীতিতেও ঘটেছে। তাই ব্যাংকে সাময়িক ভিড় দেখলেই সেটিকে চূড়ান্ত বিপর্যয় ভাবার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কেবল তথ্যবিভ্রাট বা গুজব কাজ করছে না; বরং অতীতের কিছু ঋণ বিতরণ সংক্রান্ত অনিয়মও মানুষের মনে সচেতনতা বাড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ বিতরণ এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির মতো বিষয়গুলো জনপরিসরে এসেছে। যখন নতুন ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পর্ষদ এই পূর্ববর্তী অনিয়মের তথ্যগুলো সামনে আনে, তখন একদিকে যেমন স্বচ্ছতার বার্তা যায়, অন্যদিকে সাময়িকভাবে মানুষের মধ্যে এক ধরণের বাড়তি সতর্কতাও তৈরি হয়। ফলে তারল্যের ওপর সাময়িক চাপ সৃষ্টি হয়।

অনেকে অভিযোগ করছেন যে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের চাহিদামতো সম্পূর্ণ অর্থ একবারে দিচ্ছে না। বাস্তবতা হলো, এটি সংকট ব্যবস্থাপনার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। প্রথম কয়েকজন গ্রাহক যদি ভল্টের পুরো নগদ টাকা নিয়ে যান, তাহলে পরবর্তী শত শত গ্রাহক সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই সীমিত পরিমাণে হলেও অধিকসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা একটি সাময়িক কৌশল মাত্র।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেওয়া এবং একই সাথে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, নতুন ব্যবস্থাপনার ওপরও জনগণের প্রত্যাশা অনেক। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমেই মূলত দীর্ঘমেয়াদী আস্থা ফিরে আসে।

এই সময়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দায়িত্বও অনেক বেশি। বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সাময়িক সতর্কতায় একযোগে বিপুল অর্থ তুলে নিতে থাকে, তবে ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই বৃহত্তর আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সবাইকে বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ গ্রাহকদেরও উচিত যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়ে সচেতনতা বজায় রাখা।

সবশেষে বলতে হয়, ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় মূলধন টাকা নয়— মানুষের বিশ্বাস। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে না পারলে তারল্যের সাময়িক চাপ কাটলেও মানসিক সংশয় দূর হয় না। এই সময়ে প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, প্রজ্ঞা; গুজব নয়, সঠিক তথ্য; এবং দায় এড়ানো নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। কারণ একটি সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় থাকা মানে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত শক্তিশালী থাকা।

error: Content is protected !!