সম্প্রতি চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ফ্লোরিডা সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তীব্র কটাক্ষ। খোদ নিজ দলের হাইকমান্ড থেকেও এসেছে সমালোচনা। কিন্তু আসলেই কি তিনি ‘মশা মারা শিখতে’ সরকারি টাকায় আমেরিকা যাচ্ছিলেন? নাকি পুরো বিষয়টির পেছনে রয়েছে এক বিশাল ভুল বোঝাবুঝি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল ব্রিফিং?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র, যা জনমনে তৈরি হওয়া হাসির খোরাককে এক মুহূর্তে ম্লান করে দিতে পারে।
১. সরকারি খরচে ভ্রমণ নয়, আমন্ত্রক বিশ্বখ্যাত ‘ভ্যালেন্ট বায়োসেন্স’
সবচেয়ে বড় ভুল তথ্যটি ছড়ানো হয়েছে সফরের খরচ নিয়ে। এই সফরে বাংলাদেশ সরকার বা সিটি কর্পোরেশনের এক টাকাও ব্যয় হওয়ার কথা ছিল না। ডা. শাহাদাতকে ফ্লোরিডায় তাদের ল্যাব ও কারখানা পরিদর্শনের জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল মশক নিধনে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যালেন্ট বায়োসেন্স’ (Valent BioSciences)।
২. কী এই ভ্যালেন্ট বায়োসেন্স এবং কেন এই সফর?
মশা মারার চিরাচরিত ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া দেওয়ার পদ্ধতি যে আধুনিক বিশ্বে অকার্যকর, সেটি একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. শাহাদাত ভালো করেই জানেন। ভ্যালেন্ট বায়োসেন্স মূলত মশার লার্ভা বা ডিম ধ্বংস করার আধুনিক জৈবিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে।
ভেক্টোব্যাক (VectoBac): এটি তাদের মূল পণ্য, যা একটি সম্পূর্ণ জৈবিক লার্ভিসাইড। Bacillus thuringiensis israelensis (Bti) নামক একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে এটি তৈরি হয়, যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে কেবল মশার লার্ভা ধ্বংস করে।
ওয়ালস পদ্ধতি (WALS – Wide Area Larvicide Spray): এটি তাদের নিজস্ব স্প্রে-পদ্ধতি। এডিস মশা সাধারণত যেসব ছোট, গোপন বা দুর্গম জায়গায় ডিম পাড়ে, এই স্প্রে নিখুঁতভাবে সেখানে গিয়ে লার্ভা ধ্বংস করে।
জিকা ভাইরাস জয়ী প্রযুক্তি: ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যখন মারাত্মক ‘জিকা’ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন এই ভেক্টোব্যাক ও ওয়ালস পদ্ধতি ব্যবহার করেই মিয়ামি-ডেড এলাকার সংক্রমণ চক্র পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবনের জন্য ২০১৭ সালে কোম্পানিটি মর্যাদাপূর্ণ ‘শিকাগো ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’ পায়।
প্রথাগত ফগিং বনাম আধুনিক লার্ভিসাইড:
সাধারণত সন্ধ্যায় যে ফগিং করা হয়, তা উড়ন্ত মশা মারার জন্য। কিন্তু ডেঙ্গু ও জিকা ছড়ানো এডিস মশা কামড়ায় দিনের বেলায়। দিনের বেলা ফগিং করলে মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো উপকারী কীট-পতঙ্গ মারা যায়। ভ্যালেন্টের মূল কৌশল হলো—উপকারী পোকার ক্ষতি না করে, দিনের বেলায় লার্ভা অবস্থাতেই এডিস মশাকে গোড়া থেকে নির্মূল করা।
৩. চট্টগ্রামের সুদূরপ্রসারী লাভ: কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব
ডা. শাহাদাত হোসেন কেবল এই প্রযুক্তি কিনতেই ফ্লোরিডা যাচ্ছিলেন না। চট্টগ্রামে ইতিমধ্যে এই কোম্পানির লার্ভিসাইড ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গেছে। মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাতের মূল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন—তিনি ভ্যালেন্ট বায়োসেন্সকে চট্টগ্রামে একটি নিজস্ব ফ্যাক্টরি বা কারখানা স্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
কোম্পানিটি এই প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। আর সেই সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) এবং চূড়ান্ত আলোচনার অংশ হিসেবেই তারা মেয়রকে নিজেদের খরচে ল্যাব পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানায়। চট্টগ্রামে এই কারখানা হলে বাংলাদেশ শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় মশক নিধন প্রযুক্তির হাব হতে পারতো।
দলের ভেতরের শত্রু কারা? তারেক রহমানকে ভুল বোঝাল কে?
রাজনীতিতে পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু একজন পেশাদার চিকিৎসক এবং মেয়রের এমন একটি দূরদর্শী ও ইতিবাচক উদ্যোগকে যেভাবে সস্তা ট্রোলের শিকার বানানো হলো, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে বিএনপির ভেতর থেকেই। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এই বিষয়ে কারা ব্রিফ করেছে? যারা ব্রিফ করেছে, তারা হয় চরম অজ্ঞ, না হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডা. শাহাদাতকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে চেয়েছে। নিজের দলের একজন যোগ্য নেতার এমন একটি আন্তর্জাতিক অর্জন ও দেশের জন্য কল্যাণকর উদ্যোগকে যেভাবে দলের ভেতরেই ‘কুরবানি’ দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, তাকে এক কথায় ‘ডিজাস্টার’ বা বিপর্যয় বলা চলে।
ব্যক্তি ডা. শাহাদাতকে রাজনৈতিক কারণে কেউ অপছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমূল বদলে দেওয়ার মতো একটি বিজ্ঞানসম্মত ও দূরদর্শী চিন্তায় এভাবে জল ঢেলে দেওয়া কোনো সচেতন নাগরিকের কাজ হতে পারে না। ট্রোল আর মশকরার আড়ালে চাপা পড়ে গেল বাংলাদেশের একটি বড় সম্ভাবনা। এখন প্রশ্ন একটাই—দলের ভেতরের সেই ‘ষড়যন্ত্রকারী’ বা ভুল তথ্য সরবরাহকারীরা আসলে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে?