
মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে মানুষের সবচেয়ে বড় এবং গৌরবময় অর্জন আধুনিক প্রযুক্তি নয়, সুউচ্চ প্রাসাদ নয়, কিংবা বৈশ্বিক ক্ষমতার বিস্তৃতিও নয়; মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সুনিপুণভাবে একজন খাঁটি ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা। অথচ বর্তমান সময়ে এসে আমাদের সেই ঐতিহাসিক অর্জনই যেন সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চারপাশের জনসমুদ্রে অসংখ্য মানুষ বা নাগরিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও, প্রকৃত মনুষ্যত্ব বা মানবিক আচরণের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে আসছে। সমাজে প্রচলিত আইন ও বিচারিক কাঠামো সচল থাকলেও, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বিবেকের প্রাতিষ্ঠানিক ভিতটি যেন নীরবে ও গোপনে পুনর্গঠনের দাবি রাখছে।
আমরা বর্তমান বিশ্ব ও সমাজে এমন একটি যুগসন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছি, যখন প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক পরিকাঠামোর ভেতরের ক্ষয়গুলো বাহির থেকে সহজে দৃশ্যমান হয় না। এই নীরব পরিবর্তনের হয়তো কোনো জোরালো শব্দ নেই, কিন্তু এর সামগ্রিক সামাজিক অভিঘাত অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সমাজে ভিন্নমত বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সুস্থ যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই দলবদ্ধ সামাজিক চাপ সৃষ্টি কিংবা এক ধরণের বিশেষ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সামাজিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে একতরফা কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর যে প্রবণতা, তা একটি সুশাসিত ও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য সচেতনতামূলক সংকেত।
বিশ্বের বুকে মানুষের মুখে মানবতার ভাষা প্রকাশ পেলেও প্রাত্যহিক আচরণে অনেক সময় তার বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে। যে সমাজে পারস্পরিক শিষ্টাচারের জায়গায় সুন্দর আচরণ, ব্যক্তিগত সততার জায়গায় আমানত রক্ষা করা, সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারের জায়গায় সমতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রভাবের পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতার সঠিক প্রদর্শন সর্বোচ্চ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার কথা, সেখানে এই উপাদানগুলোর অনুপস্থিতি একটি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশকে মন্থর করে তোলে।
পারিবারিক বন্ধনের দিকে তাকালে দেখা যায়, একজন মা তাঁর সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিজের পুরো জীবন আনন্দচিত্তে উৎসর্গ করেন। অথচ পরিবর্তিত বাস্তবতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সম্মানিত প্রবীণদেরই জীবনের শেষভাগে এসে সঠিক যত্ন বা পারিবারিক সাহচর্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যে নতুন প্রজন্মের হাতে দেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব ও সুন্দর স্বপ্ন থাকার কথা, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যখন একটি সমাজে প্রকৃত যোগ্য ও সৎ মানুষরা নীরবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান, তখন সামাজিকভাবে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে। এর ফলে যোগ্যতার চেয়ে বাহ্যিক প্রভাব এবং সাময়িক সুবিধাবাদ বা পক্ষশক্তির অবস্থান শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সময়ে জনপরিসরে এমন কিছু ঘটনা বা পারিবারিক বিষয় আলোচিত হয়, যার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। এই ধরণের স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয়ে প্রকৃত সত্য নির্ধারণের একমাত্র এবং আইনি পথ হলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখা। সমাজে যখনই কোনো সাধারণ বিষয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়, তখনই বুঝতে হবে আমাদের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের সুতোয় কোথাও না কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে।
যখনই কোনো অনিয়ম বা অন্যায্য আচরণ সমাজে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হয় না, তখন সাধারণ ও নিরীহ মানুষের সমাজিক আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক কাজের পরিধি সংকুচিত হয়ে আসে। এমতাবস্থায় সামাজিক নীরবতা কখনো প্রকৃত নিরপেক্ষতা হতে পারে না, বরং তা পরোক্ষভাবে অন্যায্য প্রক্রিয়াকেই দীর্ঘস্থায়ী করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে সমাজব্যবস্থায় সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষরা ভয়ে বা সংকোচে নিজেদের গুটিয়ে রাখেন, সেই সমাজে শেষ পর্যন্ত অনিয়মের কণ্ঠই সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির সূচকে নির্ধারিত হয় না, বরং তা নির্ধারিত হয় সেই জাতির সুদৃঢ় নৈতিক মেরুদণ্ডের ওপর। আমাদের সেই নৈতিক ভিত্তিটি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে বাহ্যিক উন্নয়নের বড় বড় অট্টালিকাও সমাজের প্রতিটি নাগরিকের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে না। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়; বরং আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের ভেতরের সুপ্ত বিবেকের এক মহিমান্বিত পুনর্জাগরণ।
একটি মর্যাদাবান ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে আমাদের প্রধানত চারটি স্তম্ভের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে—পারিবারিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আদর্শ চরিত্র গঠন, সমাজজুড়ে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে আইনের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সমপ্রয়োগ নিশ্চিত করা। এই চার মূল ভিত্তির সঠিক সমন্বয়ই পারে আমাদের বর্তমান সামাজিক আস্থাকে পুনরায় শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে।
আমাদের আজকের এই যাত্রাপথে একটি চিরন্তন প্রশ্ন সবার মনেই থেকে যায়—আমরা কি ভবিষ্যতে এমন একটি সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে কেবল বাহ্যিক ক্ষমতাই সত্য ও ন্যায়কে নির্ধারণ করবে? যেখানে দলবদ্ধ ভয়ভীতি সাধারণ মানুষের অধিকারকে সংকুচিত করবে? নাকি আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য এমন একটি সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই, যেখানে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল বা সাধারণ মানুষটিও নির্ভয়ে নিজের সত্য প্রকাশ করতে পারবে, প্রবীণ নাগরিকরা সর্বোচ্চ সামাজিক সম্মান পাবেন, শিশুরা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠবে, মেধা ও যোগ্যতা কখনো কোনো অন্যায্য প্রভাবের কাছে মাথা নত করবে না এবং দেশের আইন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে?
একটি সুন্দর সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে সবসময় কোনো বাহ্যিক শত্রুর প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও আমাদের নিজেদের বিবেকের নীরবতা, অন্যায়ের সঙ্গে নীরব আপস এবং মানবিকতার অনুপস্থিতিই একটি সমাজকে স্থবির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ তাই সময়ের সবচেয়ে বড় ও জোরালো আহ্বান একটাই—আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কেবল মানুষের ভিড় নয়, মানুষের অন্তরে মনুষ্যত্ব এবং নৈতিকতারও গৌরবময় প্রত্যাবর্তন ঘটুক। কারণ, একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে তার সংবিধানে, কিন্তু একটি সুন্দর সমাজ চিরকাল টিকে থাকে মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও অনন্য মানবিকতায়।