রূপপুরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরকারি দরের চেয়ে আট গুণ বেশি

তদন্ত প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন এলাকা ‘গ্রিন সিটি’র কেনাকাটায় বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ পর এবার আরও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। আবাসন প্রকল্পের ১১টি ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় এই ভয়াবহ অনিয়ম ও মেগা দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়।

সিএজি কার্যালয়ের চূড়ান্ত নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এই কেনাকাটায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত সরকারি দরের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ ঠিকাদারদের পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি দাপ্তরিক প্রাক্কলন অনুযায়ী যেসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত দাম ছিল ২৬ কোটি ৯৯ লাখ (প্রায় ২৭ কোটি) টাকা, সেগুলোর বিপরীতে রহস্যজনকভাবে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এই একটি খাতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। দরপত্র তৈরি, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ এবং বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধ— প্রায় প্রতিটি ধাপেই নিয়মের চরম লঙ্ঘন হয়েছে বলে অডিট বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে।

কৌশলে দাম বাড়ানোর অভিনব পদ্ধতি
নিরীক্ষকেরা দরপত্র ও নথি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের এই আবাসন নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছে। বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটরের দাম ঠিকাদারেরা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়িয়ে ধরলেও, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ (এসি) অন্য কয়েকটি কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম অনেক কম দেখানো হয়। এর ফলে দরপত্রের মোট চূড়ান্ত মূল্য দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য ২ শতাংশ কম থাকে। ওপর থেকে মোট দরটি নিয়মের মধ্যে ও গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোতে কয়েক গুণ বাড়তি মূল্য বসিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যেমন, গ্রিন সিটির ৭ নম্বর ভবনের একটি উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের নির্ধারিত সরকারি মূল্য ছিল মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, কিন্তু ঠিকাদারের বিল ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি ট্রান্সফরমারের দাম ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একইভাবে ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকার নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের দাম ৩ কোটি ২ লাখ এবং ১০ লাখ টাকার প্যানেলের দাম ধরা হয়েছে ২ কোটি টাকা। দুটি জেনারেটরের সরকারি মূল্য ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে একটি মাত্র ভবনেই পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতিতে অতিরিক্ত ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বাড়তি তুলে নেওয়া হয়েছে।

তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ লোপাট

সরকারি প্রাক্কলন তোয়াক্কা না করে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে:
মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: পাঁচটি ভবনের কাজের বিপরীতে ৯২ কোটি টাকা বিল পেয়েছে, যেখানে সরকারি দর ছিল ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
সাজিন এন্টারপ্রাইজ: চারটি ভবনের কাজের বিপরীতে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বিল পেয়েছে, যেখানে সরকারি দর ছিল ৯ biography কোটি ৮২ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এমএসসিএল-জিকেবিপিএল (যৌথ উদ্যোগ): দুটি ভবনের কাজের বিপরীতে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বিল পেয়েছে, যার প্রকৃত সরকারি দর ছিল ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ
সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, কোনো দরদাতা অস্বাভাবিক দাম প্রস্তাব করলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তৎকালীন কমিটি তা করেনি। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান এবং সদস্যসচিব ও পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলমসহ বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সিএজি। একই সঙ্গে আপত্তিকৃত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় দুর্নীতির মামলায় নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গ্রেপ্তার করেছিল।

মেগা প্রকল্পের এই মেগা দুর্নীতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত যে এখানে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাট ও মেগা দুর্নীতি হয়েছে। যেহেতু দেশে আরও অনেক মেগা প্রকল্প চলমান, তাই এই দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় জাতীয় অর্থের এই অপচয় ও প্রকাশ্য লুটপাট রোধে অন্য কোথাও সঠিক বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে না।”

সূত্র : প্রথম আলো

error: Content is protected !!