
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের চার মাস পূর্তির প্রেক্ষাপটে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মূল্যায়ন, ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান প্রশাসনের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে ‘আগামীর সময়’-এর সাথে এক বিশেষ এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাজকুমার নন্দী। পাঠকদের জন্য মান্নার সেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
আওয়ামী সরকার হঠানোর আন্দোলনে ৪২টি রাজনৈতিক দল যুগপৎভাবে রাজপথে সক্রিয় থাকলেও নির্বাচনের পর মাত্র ২ শরিককে প্রতিমন্ত্রী করায় ৩১টি দল কিছুই পায়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহমুদুর রহমান মান্না ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি বলতেই পারেন, যেভাবে কথা ছিল সেভাবে তারা কথা রাখেনি। রাজনীতিতে দেওয়া ওয়াদা কখনো ফেরত নেওয়া যায় না। সেটি হয় বাস্তবায়ন করতে হয়, না হলে জনগণকে বুঝিয়ে বলতে হয় কেন পারা গেল না। কিন্তু বিএনপি এর কিছুই করেনি।”
তিনি আরও বলেন, আন্দোলন করতে গিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চসহ অন্য দলগুলো মার খেলো, গুলি খেলো, জেল খাটলো—অথচ বর্তমান সরকার তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে, যা কোনো সুস্থ রাজনীতি হতে পারে না। শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন বিএনপি করেনি বলেই তিনি মনে করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-২ আসন থেকে মান্না নির্বাচন করলেও বিএনপি প্রথমে তাকে সমর্থন দিয়ে পরে নিজেদের দলীয় প্রার্থী দাঁড় করায়। একে ‘প্রতারণা’ বা ‘কথার বরখেলাপ’ আখ্যা দিয়ে মান্না বলেন, “আমাকে কথা দেওয়ার পরও কেন পজিশন পাল্টানো হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। খোদ তারেক রহমান সেখানে গিয়ে মিটিং করে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন, যার প্রভাব নির্বাচনে পড়েছে।”
নির্বাচনোত্তর সরকারে দুজন শরিক নেতাকে স্থান দেওয়া প্রসঙ্গে মান্না স্পষ্ট করে বলেন, “একটা-দুটা প্রতিমন্ত্রী বানালেই ‘জাতীয় সরকার’ হয়ে যায় না। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না যে তারা ওয়াদা রেখেছে। দেশের যে কাউকেই জিজ্ঞেস করলে বলবে এটি কোনো জাতীয় সরকার নয়, এটি খাঁটি বিএনপির সরকার এবং এটি এককভাবে বিএনপির সরকার হিসেবেই চলছে।”
সরকারের চার মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, “এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় না হলেও, অ্যাজ গভর্নমেন্ট এই চার মাসে গভর্নমেন্ট হ্যাজ গেইন নাথিং (সরকারের অর্জন কিছুই নেই)। মানুষ যে বিরাট আশা নিয়ে ভোট দিয়েছিল, তার কোনো স্ফুরণ বা জাগরণ জনগণের মধ্যে দেখছি না, বরং হতাশা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।”
তিনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার সমালোচনা করেন। একই সাথে দেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ বা চাকুরির নিয়োগ না থাকায় মানুষের মাঝে হতাশার চিত্র রয়েছে এবং এ কারণে মিডিয়াগুলোও এখন সমালোচনামুখর বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পার্লামেন্টে যখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তখন অন্য কোনো উপায়ে তাদের আইনিভাবে ফেরার সুযোগ নেই।
তবে দেশের সমসাময়িক রাজনীতিকে ‘ঘোলাটে’ ও ‘আনসেটেল্ড’ বা ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি। মান্না বলেন, “জামায়াত অনেক বছর পর যে সুযোগ পেয়েছে, তা হারানোর শঙ্কায় রয়েছে। তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল হিসেবে যেভাবে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল, তা নিচ্ছে না। আওয়ামী লীগ আবার ফেরত আসে কি না—এই ভয়ে জামায়াত এখন মূলত একটি ‘ইতিবাচক নিষ্ক্রিয় বিরোধী দল’ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে, সংসদেও তাদের জোরালো কণ্ঠ দেখা যাচ্ছে না।”
সর্বশেষে, সংবিধান সংস্কার একতরফাভাবে জুলাই মাসেই সরকার নিজেরা করতে চায় উল্লেখ করে মান্না জানান, বিএনপি এককভাবে এটি করলে পরবর্তীতে জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান কী হয়, তা দেখার জন্য তারা অপেক্ষা করছেন।