শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর

আজমিরা খানম:
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি ভোলেননি তাঁর প্রিয় বন্ধু, সহপাঠী ও সহযোদ্ধারা। সময়ের চক্রে ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে আবারও ফিরে এসেছে বাঙালির মুক্তির ও বিপ্লবের স্মৃতিময় জুলাই। আর জুলাই এলেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসজুড়ে একাকার হয়ে ফিরে আসে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বীরত্বগাথা। এই স্মৃতি শুধু বেদনার বা শোকের নয়; এটি একই সাথে অসীম সাহস, মহান আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বীরোচিত আত্মত্যাগের দুই বছর পার হলেও তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি তাঁর চারপাশের মানুষগুলো। ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া ও দেবদারু সড়ক, ইংরেজি বিভাগের করিডোর, চেনা আড্ডার স্থান, মিডিয়া চত্বর, স্বাধীনতা স্মারক এবং আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি কোণ আজও যেন তাঁর চিরচেনা উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

বন্ধুদের কাছে আবু সাঈদ ছিলেন সাহস, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁরা জানান, সাঈদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মিশুক ও সহানুভূতিশীল।

সাঈদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাকিল আবেগঘন কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আবু সাঈদ সব সময় বিপদ-আপদে সবার পাশে থাকতেন। কোনো প্রয়োজনে সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তাঁর সেই বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের দৃশ্য আজও আমাদের চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। ক্যাম্পাসে কেউ রক্তের প্রয়োজনে দিশেহারা হলে তিনি নিজে রক্ত দিতেন, না হলে ব্যবস্থা করে দিতেন।”

সহযোদ্ধা মো. শামসুর রহমান সুমন বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের শুরু থেকেই আবু সাঈদ ছিলেন সামনের সারিতে। ৩ জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হলে সাঈদ নিজেই সামনে এসে দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ১২ জুলাই হামলার পর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সাঈদ বলেছিলেন, “কারা আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে মরতে প্রস্তুত আছো? এদিকে আসো। যারা সামনে ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা দেবে।” তাঁর এই অদম্য সাহস আজও আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের পথ দেখায়।

ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহ্সীনা আহ্সান বলেন, “টেলিভিশনে পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আমার প্রিয় ছাত্রকে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আবু সাঈদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও নীরব স্বভাবের একজন শিক্ষার্থী। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া। মেধাভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিবাদেই তিনি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন এবং নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।”

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী সাঈদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “আবু সাঈদকে দেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁর হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনা আর যেন কখনো না ঘটে, সে জন্য আমরা কাজ করছি।” তিনি জানান, আবু সাঈদের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি আবাসিক হল, স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর, তোরণ ও ‘আবু সাঈদ গেট’ নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছেন, আবু সাঈদের এই মহান স্মৃতি সংরক্ষণে যেন দ্রুত স্থায়ী ও দৃশ্যমান উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। তাঁদের ভাষায়, আবু সাঈদ শুধু আমাদের অতীত স্মৃতিতে নয়, আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি চেতনায় চিরকাল জাগ্রত থাকবেন।

জুলাই বিপ্লব এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন:
error: Content is protected !!