মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আল জাজিরা-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী ইরানের বন্দর এলাকায় অবরোধ বজায় রেখেছে এবং তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। অন্যদিকে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলসহ পণ্য পরিবহন সীমিত করে রেখেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের সরবরাহ চুক্তিতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। পরবর্তীতে তা কিছুটা কমলেও শুক্রবার তাৎক্ষণিক বেচাকেনায় দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১১ ডলারের কাছাকাছি। রয়টার্স জানায়, শুধু এ সপ্তাহেই দাম প্রায় ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সংঘাত শুরুর আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ কম। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, স্বল্প সময়ে কোনো সমাধান পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। মধ্যস্থতাকারী যেই হোক, আলোচনার অগ্রগতি ধীরই থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইরান সতর্ক করেছে, নতুন করে হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির তেল কোম্পানিগুলোকে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। ইতোমধ্যে শেভরন-এর প্রধান নির্বাহীসহ জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
সংঘাতের কারণে ইরানের অর্থনীতি আরও সংকটে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তেল রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলছে। সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশের বেশি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ পথের যেকোনো বিঘ্ন শুধু জ্বালানি বাজারই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।