
রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় এবং চলতি অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই নতুন নির্দেশনার আওতায় দেশের সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্দিষ্ট কিছু খাতের বরাদ্দকৃত ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস বা পরিমার্জন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১-এর উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়।
পরিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোটরযান, জলযান ও আকাশযানসহ নতুন যানবাহন ক্রয়ের জন্য যে ৭ হাজার ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, সেই খাতের ব্যয় আপাতত স্থগিত থাকবে। তবে ১০ বছরের পুরনো টিওঅ্যান্ডইভুক্ত গাড়ি প্রতিস্থাপন এবং নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে গাড়ি কেনা যাবে।
এক্ষেত্রে সরকার পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি যুগান্তকারী শর্ত জুড়ে দিয়েছে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ক্ষেত্রে নতুন বা প্রতিস্থাপিত গাড়ি কেনার সময় অ্যাম্বুলেন্স এবং নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত বিশেষ যানবাহন ছাড়া অন্য সব ধরনের নতুন গাড়ি অবশ্যই ‘পূর্ণ বৈদ্যুতিক’ বা ইলেকট্রিক (Electric Vehicle) হতে হবে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম বা ঋণ প্রদানের ৪৩০ কোটি টাকার বরাদ্দও আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন পরিপত্রে পরিচালন বাজেটের আওতায় থাকা ১ লাখ ২১ হাজার ৫১১ কোটি টাকার সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকে খরচ করার প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন আবাসিক, অনাবাসিক বা অন্যান্য অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণের ৬১ হাজার ৭Nj৬২ কোটি টাকার খাতের ব্যয়ও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলমান কোনো নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি যদি ৭০ শতাংশ বা তার বেশি হয়ে থাকে, তবে অর্থ বিভাগের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেই কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করা যাবে।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচালন বাজেটের ৬ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা আপাতত ব্যবহার করা যাবে না। তবে উন্নয়ন বাজেটের অধীনে চলমান প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্ত প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে তহবিল ব্যবহার করা যাবে। একই সাথে পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের জিওবি (GoB) অংশের সংরক্ষিত বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অর্থ বিভাগের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও ব্যয় সাশ্রয়ী ও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি নিজস্ব অর্থায়নে কোনো ধরনের বিদেশী প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করা যাবে না। তবে বিদেশী সরকার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো দেশের দেওয়া সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নের মাস্টার্স, পিএইচডি, স্কলারশিপ, ফেলোশিপ কিংবা বৈদেশিক উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ আগের মতোই উন্মুক্ত থাকবে।
এর বাইরে দেশীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মৌলিক ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের আন্তর্জাতিক অংশটি উপযুক্ত বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা যাবে। প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) এবং ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টের (এফএটি) মতো অত্যন্ত প্রযুক্তিগত বিষয়ের ক্ষেত্রে কেবল বিশেষ বা বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে কারিগরি সনদপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের বিদেশ সফর বিবেচনা করা হবে। তবে এক্ষেত্রেও কোনো কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর চেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো থার্ড পার্টি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে বসেই পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য পরিপত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, সব ধরনের ব্যয়ের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।