বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট কেবল দুটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং অবসরের পর তাদের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসাস্থল। দীর্ঘ চাকরি জীবনে বেতনের একটি অংশ নিয়মিত চাঁদা হিসেবে জমা দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রেখেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে ‘৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট’ হওয়ার অভিযোগ জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন হলো—সত্যিই কি ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, নাকি এটি তথ্যগত বিভ্রান্তি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সমন্বয়ে তৈরি একটি বিতর্ক?
আয়-ব্যয়ের হিসাব ও কাঠামোগত ঘাটতি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে ৪ শতাংশ হারে কল্যাণ ট্রাস্টে এবং ্বং ৬ শতাংশ হারে অবসর সুবিধা বোর্ডে চাঁদা জমা হয়। মাসিক হিসাবে কল্যাণ ট্রাস্টে প্রায় ৫৪ কোটি এবং অবসর বোর্ডে প্রায় ৮১ কোটি টাকা জমা পড়ে। এর সঙ্গে স্থায়ী আমানত ও অন্যান্য বিনিয়োগের মুনাফাও যুক্ত হয়।
অন্যদিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দুই হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাসিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি কাঠামোগত ঘাটতি বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, এ ঘাটতি বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যেখানে প্রতিবছর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, সেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত?
প্রশাসনিক স্থবিরতা ও অডিট প্রক্রিয়া
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত, অফিস স্থানান্তর, নতুন জনবল নিয়োগ এবং সার্ভার জটিলতার কারণে কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অবসর বোর্ডে আবেদন গ্রহণ ও অর্থ বিতরণ কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী ভোগান্তিতে পড়েন।
এই প্রেক্ষাপটে একাধিক সভায় ফান্ডের ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে বিশেষ অডিটও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা যায়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, অডিটে অর্থ আত্মসাতের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদি প্রকৃতপক্ষে অর্থ আত্মসাৎ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে হয়েছে—সেটির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। কারণ প্রতিষ্ঠান দুটির আর্থিক লেনদেন সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অর্থ বিতরণে একাধিক স্তরের অনুমোদন, যৌথ স্বাক্ষর, আইবাস++ পদ্ধতি এবং বার্ষিক অডিট ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
আবেদনজট ও ভবিষ্যৎ করণীয়
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মাউশি, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন। ফলে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ হলে তা বহু স্তরের তদারকি ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সংঘটিত হওয়ার কথা, যা একটি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার আবেদন ঝুলে আছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত অর্থের ঘাটতি, আবেদনজট এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রশ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিতর্ক ও পাল্টা বিতর্কের মাঝে প্রকৃত ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারও অবসর ভাতা আটকে আছে, কারও কল্যাণ অনুদান বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। অনেকেই চিকিৎসা, পারিবারিক দায়বদ্ধতা কিংবা জীবনযাত্রার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তাই এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক স্বচ্ছতা। সরকার যদি মনে করে কোনো অনিয়ম হয়েছে, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বর্তমান আয়-ব্যয়ের ব্যবধান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে। দেশের শিক্ষক সমাজ এখন সেই প্রশ্নগুলোরই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর প্রত্যাশা করছে।