নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও বাংলাদেশের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

-Π আতাউর রহমান:
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক রূপান্তর এখন আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। একসময় ধারণা করা হয়েছিল, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং সংঘাতের সম্ভাবনা কমাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থা এখন সহযোগিতার মাধ্যমের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। ফলে বিশ্ব ধীরে ধীরে একক বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক ও জোটনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, অভিবাসন সংকট, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। অথচ এসব সংকট মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক সংস্থাগুলো কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে জি-৭, ব্রিকস, কোয়াড, বিমসটেক কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ইস্যুভিত্তিক আন্তর্জাতিক জোটের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়াকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেমন বৈশ্বিক বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তেমনি উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট বলয়ের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া জাতীয় স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক নাও হতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত ভিত্তি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে শুধু নীতিগত অবস্থানই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন সময়োপযোগী কৌশলগত দক্ষতা। বর্তমান বিশ্বে নিরপেক্ষতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।

বিশ্ব যখন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নীয় জ্বালানি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন বাংলাদেশকে শ্রমনির্ভর অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করেছে, কিন্তু ভবিষ্যতের বিশ্বে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে হলে রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। এই অবস্থানকে কেবল আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সবুজ প্রযুক্তি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক আলোচনায় নেতৃত্বের সুযোগে পরিণত করতে হবে।

একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে উদীয়মান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক যোগাযোগ, সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা (Blue Economy), জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ যদি কার্যকর ও দূরদর্শী ভূমিকা নিতে পারে, তাহলে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মধ্যবর্তী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংযোগকেন্দ্র (Hub) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ নয়, স্থায়ী হচ্ছে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনের সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা। বিশ্ব যখন নতুন নিয়মে পরিচালিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে সেই নিয়মের অনুসারী নয়, বরং সম্ভাব্য অংশীদার ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে। আজকের বিশ্বে টিকে থাকার প্রশ্নটি আর কেবল চিরাচরিত উন্নয়নের নয়; এটি কৌশলগত সক্ষমতা ও দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতারও প্রশ্ন। যে দেশ সময়ের পরিবর্তন বুঝে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্বের অংশীদার হওয়ার সুযোগও তারই থাকবে।

error: Content is protected !!