তারেক রহমানের দায়িত্ববোধ: প্রতিশোধের বদলে রাষ্ট্রচিন্তা

- Π আতাউর রহমান:
প্রকাশ: ১০ ঘন্টা আগে

রাজনীতির কিছু বক্তব্য তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দেয়, আবার কিছু বক্তব্য ভবিষ্যতের সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি রচনার সম্ভাবনা তৈরি করে। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তেমনই একটি দূরদর্শী বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর সেই বার্তা নিছক সাময়িক কোনো মন্তব্য নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা বহন করে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন উপলব্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিবেচিত হতে পারে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেকোনো দেশের রাজনৈতিক সুস্থতা নির্ভর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার ওপর। অতীতমুখী না হয়ে ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতি করার এই আহ্বান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী যে গঠনমূলক উপলব্ধির কথা বলেছেন, তা সকল রাজনৈতিক কর্মীদের জন্যও একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। কারণ, সুদূরপ্রসারী চিন্তা ছাড়া সমাজে টেকসই উন্নয়ন ও পারস্পরিক বিশ্বাস গভীর করা সম্ভব নয়।

তবে কেবল বক্তব্যই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে তার বাস্তব প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে সম্পূর্ণ আইনের শাসনের ভিত্তিতে। অতীতের যেকোনো বিষয়ের সুরাহা হবে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আবেগের ভিত্তিতে নয়। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল শক্তি এখানেই নিহিত থাকে।

মতবিনিময় সভায় স্বাধীন গণমাধ্যম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও মুক্ত সংবাদমাধ্যম কোনো সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; বরং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনা শাসনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবাদপত্র ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেকোনো সফল গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।

আজকের তরুণ সমাজকে নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। বর্তমান সময়ের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা এবং বিতর্কের মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এই পরিকল্পনাগুলো মাঠপর্যায়ে সফল করতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সামাজিক অবকাঠামো, ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

আজকের প্রগতিশীল বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা টেকসই সুশাসন, নতুন কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা দেখতে চায়। ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো— সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী উপায়ে করা হচ্ছে।

সুতরাং, এই বক্তব্যকে যদি একটি আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তার প্রতিফলন ঘটতে হবে প্রশাসনিক আচরণ, দলীয় কর্মকৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্য দিয়েই কেবল এই দর্শনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ভিন্নমত ও সমালোচনাকে ধারণ করে পুরো জাতিকে একটি অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যেই একজন প্রকৃত দূরদর্শী নেতার পরিচয় প্রকাশ পায়।

error: Content is protected !!