সাগরে মাছ ধরার সাময়িক নিষেধাজ্ঞা চললেও চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এখন ব্যস্ততা থেমে নেই। বরং এই সময়টিই ট্রলার বোট ও নৌকা তৈরি এবং মেরামতের মৌসুম হয়ে উঠেছে। কাঠ কাটা, হাতুড়ির শব্দ আর কারিগরদের নিরবচ্ছিন্ন শ্রমে মুখর হয়ে উঠেছে উপকূলের খাল ও নদীর পাড়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রায়পুর, জুঁইদণ্ডী, পারকি, গহিরা ও সরেঙ্গা এলাকার জেলেরা মূলত বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করেন। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এখন চলছে সাগরে নামার প্রস্তুতি। তাই নতুন ট্রলার বোট ও নৌকার চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।
সরেজমিনে পারকি, সরেঙ্গা সাপমারা খাল, বাইন্যার দীঘি, ফকিরহাট ও রায়পুর বেড়িবাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি নৌকা ও ট্রলার বোট তৈরির দৃশ্য। কোথাও নতুন কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে, কোথাও পুরোনো নৌকায় লাগানো হচ্ছে আলকাতরা। কেউ পেড়েক ও লোহার পাত দিয়ে কাঠের তক্তা জোড়া দিচ্ছেন, আবার কেউ পুরোনো নৌকাকে মেরামত করে নতুন করে সাগরে নামানোর উপযোগী করছেন।
কারিগররা জানান, সারা বছর কাজের চাপ না থাকলেও বর্ষার আগে তাদের হাতে কাজের অভাব থাকে না। তবে এবছর কাঠ, লোহা ও আলকাতরাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বাড়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে।
সরেঙ্গা সাপমারা খাল এলাকায় বোট নির্মাণকারী কারিগর আবদুস সাত্তার বলেন, “আমরা অর্ডার নিয়ে ট্রলার বোট ও নৌকা তৈরি করি। আমার অধীনে পাঁচজন কারিগর কাজ করছেন। কড়ই, হিজল ও মেহগনির কাঠ দিয়ে বেশির ভাগ নৌকা তৈরি হয়। এ বছর ছয়টি বড় বোট তৈরি করেছি, যেগুলো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে ব্যবহার হবে।”
উঠান মাঝির ঘাট এলাকার জেলে আমির হোসেন বলেন, “বর্ষায় মাছ বেশি পাওয়া যায়, কিন্তু তখন সাগর খুবই উত্তাল থাকে। তাই মজবুত বোট ছাড়া সাগরে নামা ঝুঁকিপূর্ণ।”
ট্রলার মালিকদের মতে, একটি বড় ট্রলার বোট তৈরি করতে এখন ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। ট্রলার মালিক মো. ইলিয়াছ বলেন, “আগে যেখানে ২০-২৫ লাখ টাকায় একটি বোট তৈরি করা যেত, এখন সেখানে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। তবুও ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।”
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, আনোয়ারায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩১ জন, আর মোট জেলের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তিন বছর আগের জরিপ অনুযায়ী, এখানে মাছ ধরার ট্রলার ছিল ৯২৪টি। তবে পেশা পরিবর্তনের কারণে জেলে ও ট্রলারের সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রাশিদুল হক বলেন, “চলতি বছর আনোয়ারা উপকূলে ছয়টির বেশি নতুন ট্রলার বোট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া ছোট-বড় দেড় শতাধিক নৌকা তৈরি হচ্ছে। কোনো অবৈধ ট্রলার এখানে নেই, তবে জেলেদের পেশা পরিবর্তনের কারণে ট্রলারের সংখ্যা কিছুটা কমছে।”
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ারার উপকূলে এই কর্মযজ্ঞ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।