কাঁচাবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা

বাণিজ্য প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ১২ ঘন্টা আগে

দেশের কাঁচাবাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এক অভিনব ও কৃত্রিম কৌশল বেছে নিয়েছেন বিক্রেতারা, যা সাধারণ ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ নগর-শহরের বাজারগুলোতে ঢুকলেই এখন চোখে পড়ে বিভিন্ন রঙের বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার। টকটকে লাল আলোয় আম বা আপেল, গাঢ় সবুজ আলোর নিচে শাকসবজি এবং নীলচে আলোর নিচে মাছ প্রদর্শন করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ বিপণন বা সাজসজ্জার কৌশল মনে হলেও, এর আড়ালে পণ্যের প্রকৃত মান ও রঙ আড়াল হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ ভোক্তারা।

পণ্যভেদে আলোর ভিন্নতা ও কৌশল:

বাজার পরিদর্শনে দেখা গেছে, ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সুনির্দিষ্ট পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট রঙের আলো ব্যবহার করা হচ্ছে। মাছ বাজারে মাছকে দীর্ঘক্ষণ তাজা ও চকচকে দেখাতে নীল বা সাদা-নীল আলো ব্যবহার করা হয়। এর ফলে বরফে থাকা মাছের প্রকৃত রঙ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার মাছের ফুলকা তাজা কি না তা নিশ্চিত করতে লাল আলোর ব্যবহার বাড়ছে, যা ফুলকাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লালচে দেখায়।

একইভাবে সবজি বাজারে কাঁচামরিচ ও শাকসবজিকে তরতাজা দেখাতে গাঢ় সবুজ ও লাল আলো এবং ফলের দোকানে ফলকে বেশি পরিপক্ক ও আকর্ষণীয় দেখাতে হলুদ বা কমলা রঙের বাল্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি পেঁয়াজ ও আলুর বাজারেও খোসার রঙ অনুযায়ী লাল ও সাদা আলোর কৃত্রিম আভা তৈরি করে পণ্যের বাহ্যিক খুঁত বা পচা অংশ আড়াল করার প্রবণতা দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ও যৌক্তিকতা:
রাজধানী ঢাকার বৃহত্তম পাইকারি ও খুচরা বাজার কারওয়ান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে এই কৌশলের সত্যতা জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পেঁপে বিক্রেতা জানান, দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে করে পণ্য পরিবহনের সময় পেঁপের গায়ে নানা ধরনের দাগ পড়ে যায়। সবুজ লাইট জ্বালালে সেই দাগগুলো সহজে চোখে পড়ে না, ফলে ক্রেতারা পণ্যটি কিনতে দ্বিধা করেন না।

অনুরূপ তথ্য দিয়ে একজন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী জানান, বস্তা থেকে বের করার পর পেঁয়াজের মধ্যে প্রচুর আলগা খোসা বা কালচে দাগ থাকে। লালচে বা রঙিন লাইট জ্বালালে সেই খুঁতগুলো আলাদা করে নজরে আসে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে এবং দ্রুত পণ্য বিক্রির স্বার্থেই তারা এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন, যা এখন প্রায় প্রতিটি দোকানেই দেখা যাচ্ছে।

ভোক্তা অভিজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাব:
কাঁচাবাজারের এই কৃত্রিম আলোর কারণে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বাজার থেকে এক রকম রঙ দেখে পণ্য কিনে বাসায় যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে পণ্যের প্রকৃত রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক সাধারণ ক্রেতা আবার বুঝতেই পারেন না কেন এই রঙিন আলো জ্বালানো হয়েছে।

বাজারে আসা ক্রেতা আমিরুল ইসলাম জানান, “ভিন্ন কালারের লাইট কেন ব্যবহার করা হয়, তা কোনোদিন গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখিনি। মনে হয়েছে আলো কম থাকায় লাইট জ্বালানো হয়েছে।” তবে শান্ত মিয়া নামের আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাজারে মাছের ফুলকার রঙ লাল দেখালোও বাসায় আনার পর দেখা যায় সেটি কালচে বা বাসি। চাক্ষুষ বিভ্রান্তি এড়াতে কাঁচাবাজারে শুধুমাত্র সাধারণ সাদা লাইট ব্যবহারের নিয়ম বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত।”

প্রশাসনিক অবস্থান ও বাজার মনিটরিং:
বাজারের এই প্রকাশ্য প্রদর্শন কৌশল ও ক্রেতাদের বিভ্রান্তি রোধে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে অধিদপ্তরের স্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরবর্তীতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

সার্বিক পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তা অধিকার কর্মীদের দাবি, বাজারগুলোতে কৃত্রিম ও রঙিন আলোর এই বিভ্রান্তিকর ব্যবহার বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষ সঠিক মূল্যে মানসম্মত পণ্য প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।

error: Content is protected !!