
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে দেশের প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৪৩ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই সেখানে সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।
লাগাতার এই অতিভারি বর্ষণের কারণে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকা থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়কসমূহ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচলে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে মাইকিং করা হচ্ছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং মানুষের যাতায়াত সহজ করতে জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার ও ড্রেনেজ কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নগরবাসী।
চট্টগ্রাম ছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবানে ১৭৬ মিলিমিটার, সীতাকুণ্ডে ১৭০ মিলিমিটার, নোয়াখালীর হাতিয়ায় ১৪৩ মিলিমিটার, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১০৬ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারের টেকনাফে ৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, মাত্র ৪৬ মিলিমিটারের হালকা বৃষ্টিতেই গতকাল রাজধানী ঢাকার কাজীপাড়া, মিরপুর, পল্লবী, নিউমার্কেট, আজিমপুর ও পুরান ঢাকাসহ অধিকাংশ এলাকার প্রধান সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। এই জলাবদ্ধতার কারণে কর্মজীবী ও সাধারণ রাজধানীবাসীকে যাতায়াতে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, দেশের কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ভারি এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তাকে অতিভারি বৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়।
মঙ্গলবার আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীর নিচু এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাব কেটে গেলেও উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সাবধানে চলাচল করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেটরি টিম (বিডব্লিউওটি) জানিয়েছে, দেশের আকাশে চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় ও একটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ মৌসুমি বৃষ্টিবলয় প্রবেশ করেছে। এই বিশেষ আবহাওয়াবস্থা আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
এই বৃষ্টিবলয়ের প্রভাবে দেশের কোথাও কালবৈশাখী বা শিলাবৃষ্টির শঙ্কা না থাকলেও দমকা বাতাস ও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতিভারি বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের সর্বোচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় ভূখণ্ডে ব্যাপক বৃষ্টির কারণে আসাম ও মেঘালয় থেকে সীমান্তবর্তী নদীগুলো দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।