মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নোয়াখালীর সুবর্ণচরসহ উপকূলীয় চরাঞ্চল একসময় ছিল মহিষ পালনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিস্তীর্ণ সবুজ চরে প্রাকৃতিক ঘাসে বেড়ে ওঠা মহিষ থেকে উৎপাদিত দুধ ও দইকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় অর্থনীতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই খাতেই দেখা দিয়েছে বড় সংকট।
বিশ্ব দুগ্ধ দিবসকে কেন্দ্র করে খামারিরা জানান, চারণভূমি সংকোচন, বসতি ও কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মহিষের সংখ্যা দ্রুত কমছে। এতে দুধ উৎপাদন কমে গিয়ে স্থানীয় দই ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারও চাপের মুখে পড়ছে।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর, হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ অঞ্চলের চরগুলো দীর্ঘদিন ধরে মহিষ পালনের জন্য পরিচিত। প্রাকৃতিক ঘাস ও উন্মুক্ত পরিবেশে গড়ে ওঠা এসব বাথান ব্যবস্থা ছিল উপকূলের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা। কিন্তু এখন অনেক চরেই চাষাবাদ, বসতি এবং বনভূমি হ্রাস পাওয়ায় সেই পরিবেশ আর আগের মতো নেই।
খামারিদের অভিযোগ, ঘাসের সংকট, রোগবালাই বৃদ্ধি, ঝড়–জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মহিষ পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ আরও জানান, কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রভাবেও পশুর ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, আগে যে হারে দুধ পাওয়া যেত, এখন তা অনেক কমে গেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী টক দইসহ অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালীর চরাঞ্চলে কয়েক হাজার মহিষ থাকলেও বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে খামারিদের ধারণা। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুরসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও গত কয়েক বছরে মহিষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চারণভূমি সংরক্ষণ, চরাঞ্চল ব্যবস্থাপনা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে এই খাত আরও সংকটে পড়বে। এতে শুধু মহিষ পালনই নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় দুগ্ধভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
খামারিদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে চরাঞ্চলের মহিষভিত্তিক দুধ ও দই শিল্প আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।