দেশের শিল্প খাতের সর্বশেষ বাণিজ্যিক পরিস্থিতি

বাণিজ্য প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ১ দিন আগে

দেশের শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদার পরিবর্তনের কারণে এক বিশেষ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কারণে বৈশ্বিক বাজারেও দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের গতি মন্থর হওয়ার পাশাপাশি সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির অনেকগুলো কারণ বিগত কয়েক বছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। বেশ কিছু সময় ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি এবং নীতিগত পার্থক্যের কারণে শিল্পখাত কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ (পিএসআই) না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করা ব্যুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে:

ওয়েভিং টেক্সটাইল খাত: উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ২৯.৩১%
জুট টেক্সটাইল খাত: উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৩৫.৫০%
ওষুধ শিল্প: উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ১০.৮১%
সিমেন্ট ও প্লাস্টার শিল্প: উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৫.৯৪%
ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প: উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ১৮.০৯%

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে, যেখানে ফিনিশড টেক্সটাইল উৎপাদন ৮.৬৭% এবং আয়রন ও স্টিল শিল্পে উৎপাদন ৬.৫৭% কমেছে।

+————————–+——————–+
| শিল্পের খাত | উৎপাদন হ্রাসের হার |
+————————–+——————–+
| জুট টেক্সটাইল | ৩৫.৫০% |
| ওয়েভিং টেক্সটাইল | ২৯.৩১% |
| ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ | ১৮.০৯% |
| ওষুধ শিল্প | ১০.৮১% |
| ফিনিশড টেক্সটাইল | ৮.৬৭% |
| আয়রন ও স্টিল | ৬.৫৭% |
+————————–+——————–+

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সুদের হার বৃদ্ধি করায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতি মন্থর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৮.৩১% বেশি। বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে অর্থ জমা থাকলেও তা শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার ফলে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত প্রায় ৩,৫৬০ টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। ফলে দেশের প্রায় দুই শতাধিক ইস্পাত কারখানার ৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। একই সাথে নির্মাণ শিল্পে মন্দার কারণে সিমেন্ট খাতে চাহিদা প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, বৈশ্বিক বাজারে প্রধান বাজারগুলোর চাহিদা হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের কারণে সামগ্রিক রপ্তানি আদেশ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক হলেও বিশ্ববাজারের তুলনায় তা অত্যন্ত কম। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা এ খাতের প্রধান অন্তরায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম (পারভেজ) চৌধুরী বলেন, এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার সমন্বয়, কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

error: Content is protected !!