ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতির পর্যালোচনা

ফাহিম হাসান:
প্রকাশ: ৫০ minutes ago

দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের একটি বড় অংশ অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৪ হাজার ৮৯৯ জন গ্রাহকের (যাদের প্রত্যেকের ঋণ ৫০ কোটি টাকার বেশি) কাছে রয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। এটি দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি, যেখানে প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
​তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই বছর আগে ২০২৪ সালের মার্চে ৩ হাজার ৭০৪ জন বড় গ্রাহকের হাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা (মোট ঋণের ২৭.৬ শতাংশ)। দুই বছরের ব্যবধানে বড় গ্রাহকদের ঋণের অংশ বেড়েছে আরও প্রায় ৫ শতাংশ।

​ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালা
​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অল্প কিছু মানুষের হাতে ঋণের বড় অংশ থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ অনিয়মিত হলে তার প্রভাব সরাসরি ব্যাংকের মূলধন ও তারল্যের ওপর পড়ে। এই ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বজুড়ে ‘এক্সপোজার সীমা’ নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ঋণের সীমা কিছুটা শিথিল করেছে।

​নতুন নিয়মে, এখন থেকে একটি ব্যাংক তাদের মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ সরাসরি (ফান্ডেড) ঋণ দিতে পারবে একজন গ্রাহককে, যা আগে ছিল ১৫ শতাংশ। তবে সরাসরি ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে মোট ঋণ কোনোভাবেই ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই নির্দেশনা কার্যকর থাকবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের বর্তমান চিত্র
​কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে মোট হিসাবধারী বা গ্রাহক ছিলেন ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮২ জন।

​ব্যাংকগুলো বড়দের ঋণ বাড়ালেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কুটিরশিল্প ও কৃষকদের ক্ষেত্রে ঋণ প্রবাহ কিছুটা মন্থর হয়েছে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৯৪৫ জন, যা মোট হিসাবের ৯৩.৭৩ শতাংশ হলেও তারা সবাই মিলে মোট ঋণের মাত্র ৯.১৯ শতাংশ পেয়েছেন। গত এক বছরে শীর্ষ বড় গ্রাহকদের ঋণ বাড়লেও বাকি ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের সম্মিলিত ঋণ উল্টো ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা কমে গেছে।

​সরকারি ব্যাংক ও খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি
​ঋণের এই কেন্দ্রীভূত অবস্থা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ১১২ জন গ্রাহকের হাতেই রয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই মাত্র এক হাজার গ্রাহকের কাছে রয়েছে।

​ঋণ বিতরণের এই ভারসাম্যহীনতার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক আর্থিক সূচকে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ব্যাপক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং খাতের ‘ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত’ (সিআরএআর) ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা ছিল। খাতসংশ্লিষ্টরা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য আনা এবং তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন।

error: Content is protected !!