নবীনগরের ঐতিহ্যবাহী বিলম্বী ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

মাজহারুল ইসলাম বাদল, বিশেষ প্রতিনিধি (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ৪৪ minutes ago

বাংলাদেশের ফলজ বৈচিত্র্যের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী টক ফল ও সবজি হচ্ছে ‘বিলম্বী’। রসালো ও মুখরোচক এই ফলটি স্থানীয় রান্নায়, বিশেষ করে ডাল এবং মাছের তরকারিতে এক অপূর্ব স্বাদ ও বৈচিত্র্য এনে দেয়। এক সময় কেবল এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে এই ফলগাছটি রোপণ করা হচ্ছে। কাঁচা অবস্থায় এটি গাঢ় সবুজ রঙের এবং পরিপক্ব হলে সুন্দর হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে।

​উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, বিলম্বী হলো অক্সিডেসি গোত্রের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ, যা কামরাঙ্গা ফলের সমগোত্রীয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Averrhoa bilimbi এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘কিউকামবার ট্রি’ বা ‘ট্রি সরিল’ নামেও পরিচিত। দেখতে অনেকটা পটলের মতো ৩ থেকে ৬ সেন্টিমিটার লম্বা এই ফলটির আদি উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে। বিলম্বী গাছ উচ্চতায় সাধারণত ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এটি একটি বারোমাসি ফলদ বৃক্ষ।
​ঐতিহাসিক পটভূমি ও উৎপাদন চিত্র
​নবীনগরে বিলম্বী গাছ সংগ্রহের ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তা ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িত। প্রায় ৯৫ বছর আগে তৎকালীন ভারতবর্ষের অবাধ যোগাযোগের সময়ে স্থানীয় মুন্সেফ আদালতের কর্মচারী নরেন্দ্র চন্দ্র মোদী মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে নবীনগর ডাকঘরের তৎকালীন পোস্টমাস্টার ইয়াকুব আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত বাগানের জন্য উপহার হিসেবে এই বিলম্বীর চারা এনেছিলেন। পরবর্তীতে সেই চারা থেকেই নবীনগরের আনাচে-কানাচে এবং প্রতিটি বাড়িতে এই ফলগাছটির বিস্তার ঘটে।

​চাষাবাদ পদ্ধতির দিক থেকে বিলম্বী অত্যন্ত ফলনশীল। একটি গাছ একনাগাড়ে ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়। স্বাভাবিক পরিচর্যাতেই একটি গাছ থেকে বর্ষাকালে আনুমানিক ৬০ কেজি এবং শীতকালে ৩০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে যত্ন নিলে প্রতি গাছে ৩০০ কেজির ওপর ফলন হওয়া সম্ভব। এই গাছের চারা মূলত বীজ থেকে তৈরি হয় এবং রোপণের তিন বছরের মধ্যে গাছে ফল আসতে শুরু করে। ফুল থেকে ফল হওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তা খাওয়ার উপযোগী হয়। বর্তমানে নবীনগরের স্থানীয় বিভিন্ন নার্সারিতে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য প্রতিটি চারা ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি বিলম্বী ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

​ল্যাবরেটরি তথ্য অনুযায়ী, বিলম্বী ফলে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে আমিষ ০.৬১ গ্রাম, তন্তু ০.৬ গ্রাম, ফসফরাস ১১.১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩.৪ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.০১ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ০.০৩৫ মিলিগ্রাম এবং অ্যাসকোরবিক অ্যাসিড ১৫.৫ মিলিগ্রামসহ নানা পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশে এই ফলের পাতা ও নির্যাস প্রথাগত বিভিন্ন উপাদানে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তরকারির পাশাপাশি এই ফল দিয়ে অত্যন্ত সুস্বাদু আচারও তৈরি করা যায়।

​স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সমাজ সচেতন ব্যক্তি কাজী কামরুল হাসান এবং সুমনা দেবনাথ জানান, আধুনিক নগরায়ণের ছোঁয়ায় গ্রামীণ পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী গাছের সংখ্যা আগের চেয়ে কিছুটা পরিমিত হয়ে এসেছে। তবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই ফলের সুদিন ধরে রাখা সম্ভব।

​নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন এই ফলের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, “বিলম্বী গাছ রোপণে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। এটি সবজি এবং আচার হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই ফলটির একটি চমৎকার বাণিজ্যিক ও রফতানি সম্ভাবনা রয়েছে।” নবীনগরবাসীর দাবি, এই ফলটিকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যেন বাণিজ্যিকভাবে রফতানি করা যায়, সেজন্য বাংলাদেশের কৃষি বিভাগ যাতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও বিপণন সহায়তা প্রদান করে।

error: Content is protected !!