আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ হারিকেন

দেশ এডিশন ফিচার ডেস্ক:
প্রকাশ: ৫২ minutes ago

“হারিকেনের মৃদু আলোয় রাতে পড়াশোনা করেছি, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও চোখে জল চলে আসে”—সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার প্রবীণ মানুষদের মুখে এখন এমনই স্মৃতিকাতরতা। কালের বিবর্তন আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নিশান ‘হারিকেন’ এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি প্রায় অপরিচিত এক বস্তু হলেও, মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও এই জনপদের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে হারিকেন জ্বালানো ছিল এক চিরচেনা নিয়মিত রুটিন।

তখনকার দিনে গ্রামে গ্রামে অহরহ বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক সৌরবাতি বা চার্জার লাইট। ফলে অন্ধকার তাড়িয়ে আলো জ্বালানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যমই ছিল কাচের চিমনিওয়ালা এই হারিকেন।

তৎকালীন গ্রামীণ জনপদে হারিকেন মানে শুধু একটি বাতি ছিল না, তা ছিল এক গভীর আবেগের নাম। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে পরম যত্নে হারিকেনের কাচের চিমনি খুলে পরিষ্কার করা, সুনিপুণভাবে কেরোসিন তেল ঢেলে কাপড়ের শলাকায় আগুন ধরানো ছিল প্রতিটি গৃহিণীর দৈনন্দিন কাজ। চাকার মতো একটি ছোট চাকতি ঘুরিয়ে কাপড়ের সেই শলাকা বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। লোহার তৈরি মজবুত ধরনি বা হাতল ধরে রাতের আঁধারেও এই বাতি নিয়ে অনায়াসে পথ চলা যেত, যা ছিল অন্ধকারের মাঝে এক আশার প্রতীক।

রমজাননগরের সোরা গ্রামের ৬০ বছর বয়সী জহুরা বেগম অতীত মনে করে বলেন, “আগে সন্ধ্যা নামলেই আমাদের প্রথম কাজ ছিল হারিকেনের কাচ ধুয়ে তেল ঢেলে আগুন দেওয়া। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য অনেক সময় পাটকাঠির আগুনে হারিকেন জ্বালাতে হতো।” স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষক মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, “পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা হারিকেনের আলোতেই পড়ালেখা করেছি। সেই আলো কম হলেও আমাদের চোখে কোনো দিন সমস্যা হতো না। অথচ এখন কত আধুনিক আলো, তাও চোখের সমস্যার শেষ নেই।”

বর্তমানে শ্যামনগর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে শতভাগ বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে গেছে। গ্রামীণ ঘরে ঘরে এখন জায়গা করে নিয়েছে সোলার প্ল্যান্ট, রিচার্জেবল চার্জার লাইট ও আধুনিক এলইডি (LED) বাতি। ফলে হারিকেন এখন পুরোপুরি অতীতের খাতায় নাম লিখিয়েছে। হারিকেনের ব্যবহার না থাকায় গ্রামীণ বাজারের দোকানগুলোতে এখন আর আগের মতো কেরোসিন তেলও কিনতে পাওয়া যায় না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রাশিদুল ইসলাম জানান, “২০ বছর আগে সন্ধ্যায় কেরোসিন তেল কেনার জন্য দোকানে মানুষের দীর্ঘ লাইন লেগে যেত। আর এখন দিন বদলে গেছে, কেরোসিনের দাম বাড়ার পাশাপাশি মানুষের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমরা আর দোকানে তেলই রাখি না।” ব্যবহারকারী না থাকায় গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে গেছেন হারিকেন মেরামতের দক্ষ কারিগররাও।

শতবর্ষী নাজির সরদার আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় রাতের হাট-বাজারে কেনাকাটা, রান্নাবান্না, অমাবস্যার রাতে পথ চলা কিংবা রাতের আঁধারে ডাকপিয়নের চিঠি বিলি—সবখানেই আলো ছড়াতো এই বাতি। আমাদের বাড়িতে এখনও একটি পুরোনো ‘তাজ হারিকেন’ ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে, যা এখন আর কেউ ছোঁয়াও না।”

জাপানি শব্দ থেকে উৎপত্তি হলেও হারিকেন দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। তবে তাপবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ এবং আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের যুগে এসে এটি আজ পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। প্রবীণদের আশঙ্কা, যেভাবে দ্রুত এটি চারপাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তাতে হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন প্রজন্মকে হারিকেন চেনাতে এটিকে জাদুঘরে গিয়ে দেখাতে হবে। প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, উঠোনে বসে হারিকেনের মৃদু আলোয় একসাথে পড়ালেখার সেই নস্টালজিয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক সোনালী অধ্যায় হয়েই থাকবে।

error: Content is protected !!