সুজানগর, ১১ জুন ২০২৬ চরম দারিদ্র্য যে অদম্য মেধা ও কঠোর ইচ্ছাশক্তির পথে কখনো অন্তরায় হতে পারে না, তা আরও একবার প্রমাণ করে দেখালেন পাবনার সুজানগরের সন্তান রঞ্জন কুমার দাস। সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর সহকারী প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যে পুরো পাবনাসহ দেশজুড়ে প্রশংসার জোয়ার বইছে।
রঞ্জন কুমার দাসের এই গৌরবময় অর্জনের পেছনে রয়েছে এক নিঃস্বার্থ বাবার আজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি। তাঁর বাবা রতন কুমার দাস পেশায় একজন সাধারণ পান ব্যবসায়ী। সুজানগর বাজারের ছোট একটি পানের দোকান থেকে প্রতিদিনের সামান্য আয় দিয়ে কোনো রকমে চলত তাঁদের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই সংসারে রঞ্জনের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো ছিল এক মহাসংগ্রাম। কিন্তু ছেলে রঞ্জনের প্রবল মেধা আর বড় ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নের কাছে সেই আর্থিক অনটন শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে। বাবা রতন কুমার দাস নিজের সব কষ্ট আড়াল করে ছেলেকে সবসময় সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
রঞ্জনের পড়াশোনার শুরুটা নিজ উপজেলা সুজানগর থেকেই। তিনি সুজানগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর পাবনা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। এরপর নিজের অনন্য মেধার পরিচয় দিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। বুয়েটের কঠোর শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই রঞ্জন তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়। সরকারি ব্যাংকের সম্মানজনক পদে নিয়োগ পেয়ে তিনি তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর করে মুখে হাসি ফুটিয়েছেন।
চাকরি পাওয়ার পর রঞ্জনের বাবা রতন কুমার দাস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে দেশ এডিশনকে বলেন, “আমি ছোট একটা পানের দোকান চালাই। অনেক দিন এমন গেছে যে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে আমাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। কিন্তু আজ আমার জীবনের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমার ছেলে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যাংকের ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ একজন বাবার জন্য আর কী হতে পারে!”
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে নবনিযুক্ত প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, “আমার এই সফলতার পুরো কৃতিত্ব আমার বাবা-মায়ের। বাবা দিন-রাত পানের দোকানে কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। পাবনা টেকনিক্যাল কলেজ এবং বুয়েটের শিক্ষকরা আমাকে সবসময় গাইড করেছেন। আমি এখন সততা ও নিষ্ঠার সাথে কর্মক্ষেত্রে দেশের সেবা করতে চাই।”
শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রঞ্জনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প দেশের লাখো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এক চরম অনুপ্রেরণা। এটি প্রমাণ করে, সঠিক লক্ষ্য, পারিবারিক সমর্থন এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো অবস্থান থেকেই দেশের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।