দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি, টার্মিনাল ও বহিনোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার কাজে দীর্ঘ ১৮ বছর পর নতুন অপারেটর নিয়োগের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০০৮ সালের পর থেকে নির্দিষ্ট ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই খাতে প্রতিযোগিতা তৈরি, সেবার মান বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই নতুন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এর আগে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করলেও, কঠিন শর্তাবলীর কারণে নতুন কোনো কোম্পানি এই খাতে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে সেবার মান আরও আধুনিক করতে এবার নতুন অপারেটর সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও রাজস্বের হিসাব
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব নাসির উদ্দিন জানান, ‘নতুন লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্বে যারা আবেদন জমা দিয়েছেন, নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তাদের পুনরায় আবেদনের প্রয়োজন নেই। ঠিক কতটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটিই চূড়ান্ত নির্ধারণ করবে।’
উল্লেখ্য, গত ২০২৩-২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যিক পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে এই বন্দর দিয়ে মোট ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার টন খোলা ও কন্টেইনারজাত পণ্য (কার্গো) ওঠানামা করেছে। জেটি ও টার্মিনাল মিলিয়ে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য ওঠানামা এবং ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাত থেকে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে।
বর্তমান বিন্যাস ও অংশীজনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) ১২টি জেটিতে ১২টি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে। চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) দেশীয় প্রতিষ্ঠান এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এ ছাড়া বহিনোঙরে সাগরে জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তরের (লাইটারিং) কাজে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে আরও ৩৩টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে মোট ৪৮টি অপারেটর প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
তবে এই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরিধি ও স্বচ্ছতা নিয়ে বর্তমান অপারেটরদের সংগঠনগুলোর মধ্যে কিছু ভিন্ন মত ও সংশয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢালাওভাবে লাইসেন্স দেওয়া হলে এই বিশেষায়িত কাজে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা ও অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
একই সুর মিলিয়ে বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর এবং শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগত কাজ, যেখানে ভারী যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ শ্রমিকের সমন্বয় প্রয়োজন। তাই নতুনদের লাইসেন্স দেওয়ার আগে কতগুলো লাইসেন্স প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা এবং অভিজ্ঞতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আবেদনের জোয়ার ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন অপারেটর লাইসেন্সের জন্য অফেরতযোগ্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ টাকা। এর আগে প্রায় ৩০০টি আবেদন জমা পড়েছিল এবং নতুন বিজ্ঞপ্তির পর আরও অন্তত ১০০টি আবেদন জমা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই আবেদন প্রক্রিয়া থেকেই বন্দরের প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবে।
তবে বন্দরের অভিজ্ঞ বার্থ অপারেটর পারভেজ আহমেদ স্পষ্ট করেন যে, লাইসেন্স পেলেই যে কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি জেটিতে কাজ পেয়ে যাবে বিষয়টি তেমন নয়। জেটি ও টার্মিনালে কাজ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, ভারী যন্ত্রপাতি এবং পূর্বকাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের পরেই চূড়ান্ত দায়িত্ব বণ্টন করা হবে।