
ফ্রেঞ্চফ্রাই, চিপস, আলুর দম কিংবা পরোটা—বাঙালির খাদ্য তালিকায় আলু ছাড়া যেন একদিনও চলে না। তবে আলুপ্রেমীদের অনেকেরই একটি সাধারণ অভিযোগ রয়েছে, আলু খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পেটে অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য কি আসলেই আলু এককভাবে দায়ী? চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের মতে, এর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। এটি মূলত নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত হজমক্ষমতা এবং আলু খাওয়ার অভ্যাসের ওপর।
প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. অরুল প্রকাশ জানান, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে আলু গ্যাসের প্রধান কারণ নয়। তবে কিছু মানুষের শরীরে অতিরিক্ত আলু খাওয়ার পর পেট ভরা অনুভূতি, ফাঁপাভাব বা সাময়িক গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, শুধু আলু নয়; খাবারটি কীভাবে রান্না করা হয়েছে এবং কতটা পরিমাণে খাওয়া হয়েছে, তার ওপর গ্যাসের সমস্যা তৈরি হওয়া নির্ভর করে। আলুতে থাকা স্টার্চের (শ্বেতসার) একটি অংশ ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম না হয়ে বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। সেখানে কোলনে থাকা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে এক ধরনের গাঁজন (Fermentation) প্রক্রিয়ায় এটি ভাঙতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার সময় হাইড্রোজেন, মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস তৈরি হতে পারে, যা কিছু সংবেদনশীল মানুষের ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, আলুতে থাকা এই ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ আমাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য ‘প্রিবায়োটিক’ হিসেবে কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে এই গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে সাময়িকভাবে পেটে গ্যাস দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, শুধু আলুকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের খাদ্য তালিকায় থাকা মটরশুটি, ছোলা, মসুর ডাল, ফুলকপি, ব্রোকলি, বাঁধাকপি এবং বিভিন্ন দুগ্ধজাত খাবারও অনেকের ক্ষেত্রে তীব্র গ্যাস ও পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যাদের শরীরে ‘ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা’ (Lactose Intolerance) রয়েছে, তাদের দুধ, দই বা পনির খাওয়ার পর এ ধরনের সমস্যা অনেক বেশি দেখা যায়।
তাছাড়া, ডিপ-ফ্রাই করা ভাজা আলুর মতো চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে পাকস্থলীতে বেশি সময় নেয়, যার ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভার হয়ে থাকে। একইভাবে, অতিরিক্ত ফাইবার, কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত খাবার এবং কার্বনেটেড পানীয়ও (কোমল পানীয়) গ্যাসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মুক্তির উপায় ও চিকিৎসকদের পরামর্শ
পেটের এই সাময়িক অস্বস্তি ও গ্যাস কমাতে চিকিৎসকেরা কয়েকটি সহজ পরামর্শ দিয়েছেন:
খাবার তাড়াহুড়ো করে না খেয়ে সবসময় ধীরে ধীরে এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খেতে হবে।
আপনার শরীরে ঠিক কোন কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে, তা ডায়েরিতে নোট করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে সন্দেহজনক খাবারগুলো কিছুদিন আলাদা করে খেয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সাধারণ গ্যাস বা পেট ফাঁপা সাময়িক হলেও, এর সাথে যদি দীর্ঘদিনের তীব্র পেটব্যথা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, ক্রনিক ডায়রিয়া, মলের সাথে রক্ত যাওয়া, অতিরিক্ত কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা বারবার বমির মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে সেটিকে সাধারণ গ্যাস মনে করে অবহেলা করা যাবে না। এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।