মসজিদের ইমাম থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

আক্তার হোসেন:
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য, জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়াকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক আয়োজন চলছে। ইরান ও ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি শহরজুড়ে মোট ছয় দিনব্যাপী এই শোক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তেহরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ধারণা, এই দীর্ঘ কর্মসূচিতে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সমাগম হিসেবে প্রায় এক থেকে দুই কোটি মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই স্মরণকালের বৃহত্তম বিদায় আয়োজনের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে বর্তমানে খামেনির রাজনৈতিক দর্শন ও জীবনের বিভিন্ন শিক্ষণীয় দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা শুরু হয়েছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রচিত বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘সেল নম্বর ১৪’ (Cell Number 14) বইটিতে তিনি নিজের জীবনের নানান চড়াই-উতরাই ও কঠোর সংগ্রামের চিত্র নিজেই ফুটিয়ে তুলেছেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইরানের এই প্রভাবশালী নেতা একসময় সাধারণ মসজিদের ইমামতি থেকেই ধাপে ধাপে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

তিনি প্রথম জীবনে মাশহাদের একটি অত্যন্ত সরু গলিতে অবস্থিত ছোট ‘ইমাম হাসান মসজিদে’ সাধারণ ইমাম হিসেবে দ্বীনি দায়িত্ব শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতার কারণে তিনি মাশহাদের অন্যতম বিখ্যাত ও বৃহৎ ‘কেরামত মসজিদে’ ইমামতি শুরু করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই মসজিদটি স্থানীয় শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সামাজিক গোষ্ঠীর মূল মিলনস্থলে পরিণত হয়। তবে তাঁর এই ক্রমবর্ধমান সামাজিক জনপ্রিয়তা ও ইসলামি বিপ্লবী চিন্তাধারায় ভীত হয়ে তৎকালীন পাহলভি রাজতান্ত্রিক সরকার তাঁর ওপর কেরামত মসজিদে ইমামতি করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

কেরামত মসজিদে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার তিন মাস পর তিনি আবারও তাঁর পুরোনো ‘ইমাম হাসান মসজিদে’ ফিরে আসেন। সেখানে তিনি দমে না গিয়ে প্রতি শনিবার মাগরিবের নামাজের পর সমসাময়িক ও সামাজিক বিষয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ও সচেতনতামূলক বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। ১৯৬৬ সালের দিকে তিনি যখন তেহরানে অবস্থান করছিলেন, তখন একটি নির্মাণাধীন মসজিদে (যা পরবর্তীতে ‘আমিরুল মুমিনিন মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়) নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়াতেন এবং তরুণদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতেন।

তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক দূরবর্তী অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠানো হলেও তাঁর আদর্শিক কাজ থেমে থাকেনি। নির্বাসিত অবস্থায় তিনি ইরনশাহরের একমাত্র শিয়া মসজিদ ‘আল-রাসুল মসজিদে’ ইমামতি শুরু করেন এবং নামাজের পর অত্যন্ত তথ্যবহুল ও শিক্ষামূলক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করতেন।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যখন মাশহাদের কুখ্যাত সামরিক কারাগারে বন্দি ছিলেন, সেখানেও তিনি তাঁর ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কারাগারে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সহবন্দিদের একত্রিত করে নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়াতেন। বন্দীশালায় তাঁর প্রখর নেতৃত্ব, চমৎকার ইমামতি এবং কয়েদিদের ওপর তাঁর ধর্মীয় বক্তব্যের গভীর ইতিবাচক প্রভাব দেখে তৎকালীন কারারক্ষীরা ভীত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রাজকীয় নির্দেশে তাকে জামাতে নামাজ পড়ানো এবং অন্য বন্দিদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের কথা বলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।

আজ খামেনির মহাপ্রয়াণে তাঁর সেই দীর্ঘ কারাজীবন, রাজনৈতিক নির্বাসন ও মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু হওয়া বিপ্লবের গল্পগুলো ইরানসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে নতুন করে অনুপ্রেরণা ও আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।

error: Content is protected !!