
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘রাঘববোয়ালদের’ বিরুদ্ধে মামলা ও সম্পদ জব্দের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়লেও, সেসব মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা। খোদ দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুততার সাথে করা অন্তত ১৫০টি হেভিওয়েট মামলার এজাহারে দুর্নীতি প্রমাণের একমাত্র প্রধান পুঁজি করা হয়েছে ‘সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন’। সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণের অভাব এবং কেবল অনুমাননির্ভর এজাহারের কারণে আইনের ফাঁক গলে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ ও প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত আদালত থেকে খালাস বা পার পেয়ে যেতে পারেন।
দুদক থেকে প্রাপ্ত মামলার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন দেশজুড়ে মোট ১ হাজার ৯৪টি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে কেবল ২০২৫ সালেই রেকর্ড ৮৭৪টি মামলা দায়ের করা হয়, যা বিশ্লেষণ করলে প্রতি কর্মদিবসে গড়ে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯টি।
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দায়ের করা অন্তত ১৫০টি মামলার এজাহারের আদল ও কাঠামো প্রায় একই ধরনের। যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী আমলাদের আসামি করা হলেও, খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ করতে গিয়ে দেখছেন যে এজাহারের তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত দুর্বল। অনেকের ক্ষেত্রে কেবল ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী ও আয়কর নথি মিলিয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ নির্ধারণ করে মামলা করা হয়েছে, যা আদালতে অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট নয়।
জানতে চাইলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মঈদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “আদালতে অপরাধ প্রমাণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তদন্তকারীদের। তারা যদি অকাট্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বিজ্ঞ আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, তবেই আসামিদের সাজা হবে। কিন্তু অনুমাননির্ভর কোনো অভিযোগপত্রের ওপর ভিত্তি করে আদালত কাউকে সাজা দেবেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে যেকোনো প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের সঠিক হিসাব ও উৎস মিলিয়ে দিতে হবে, অন্যথায় আসামিরা খালাস পাবেন।”
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রায় বিশ্লেষণ করে বলেন, “পতিত সরকারের আমলে যদি এই ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অনুসন্ধান ও মামলা করা যেত, তবে বিচার করা সহজ হতো। এখন তাদের অনুপস্থিতিতে ঢালাওভাবে মামলা ও তড়িঘড়ি তদন্ত করে শেষ পর্যন্ত কতটা প্রকৃত জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর শুরুতে মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর কমিশন তৎপরতা শুরু করলেও পরবর্তীতে দায়িত্ব নেয় মোহাম্মদ আবদুল মোমেন কমিশন। গত ১০ ডিসেম্বর নতুন এই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনুসন্ধানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ডিসেম্বরেই দায়ের হয় ৩৯টি মামলা।
এসব মামলার অন্যতম প্রধান আসামিরা হলেন— সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সংসদ সদস্য মির্জা আজম ও নাঈমুর রহমান দুর্জয় এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আসামিদের অনেককেই আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি বা ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমান এবং ডায়মন্ড ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার আগরওয়াল অন্যতম। ৫ আগস্টের পর ফাইলগুলো খোলা হলেও তড়িঘড়ি করার কারণে আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করাই এখন দুদকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।