রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে ৭২ শিশুর জন্ম

>কক্সবাজার প্রতিনিধি (দেশ এডিশন)
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

২০১৭ সালে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এর ওপর শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় ও জটিল দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ছৈয়দ আহমদ ও রাবেয়া খাতুন দম্পতির গল্পটি বর্তমান পরিস্থিতির এক বাস্তব উদাহরণ। ২০১৭ সালে ৯ সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে আসা এই পরিবারে গত ৯ বছরে আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়েছে। বর্তমানে এক নাতিসহ তাদের ১৪ সদস্যের বড় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিবারটির দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত বর্তমান খাদ্যসহায়তা এবং রান্নার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাস সিলিন্ডার এত বড় পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে ধাত্রীদের মাধ্যমে হওয়া প্রসবের হিসাব যুক্ত করলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে ৭২টি শিশুর জন্মের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিনটি নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। এই হিসাবে বছরে প্রায় ২৬ হাজার নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে।

ক্যাম্পে নিয়োজিত চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চালু থাকলেও বাস্তবে অনেক পরিবার এখনো বড় পরিবার গঠনের সনাতন মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি, যা জনসংখ্যার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান জীবনযাত্রাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলেছে আন্তর্জাতিক তহবিল সংকট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তাদের নতুন নীতিমালার আওতায় পরিবারভেদে মাথাপিছু মাসিক খাদ্যসহায়তা ৭, ১০ ও ১২ ডলারে পুনর্নির্ধারণ করেছে, যেখানে আগে সবাই সমানভাবে ১২ ডলার পেতেন।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অনেক সুস্থ-সবল কিশোর ও যুবকের জন্য মাসিক খাদ্যসহায়তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮৫৯ টাকা)। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দাবি, এই সামান্য অর্থে এক মাসের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর ফলে পরিবারগুলোর ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হচ্ছে।

কক্সবাজারের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, ৯ বছর আগে মানবিক কারণে নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রতিদিন জন্ম নেওয়া এই নতুন শিশুরা কেবল নতুন জীবন নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নতুন দায় তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমে যাওয়া এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় এই সাময়িক আশ্রয় এখন একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকটের রূপ নিয়েছে, যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।

error: Content is protected !!