
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে চরম অনীহা দেখায় এবং গ্রাহকদের সাথে অপেশাদার আচরণ করে— এমন দীর্ঘদিনের পুরনো অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভিনব এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল রবিবার (২৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের (ডিএমডি) কর্মকর্তাদের অন্তত ১০টি দল নিজেদের পরিচয় গোপন করে, সাধারণ গ্রাহক সেজে রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় যান। সেখানে তারা মুখের ওপর “সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয় না” এমন জবাবসহ নানা অজুহাতে গ্রাহক ফিরিয়ে দেওয়ার লণ্ডভণ্ড চিত্র এবং অসংগতির হাতেনাতে সত্যতা পেয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের অন্তত ৪০টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন আইনবহির্ভূত অনীহা ও অপেশাদার আচরণ খুঁজে পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো যোগ্য গ্রাহককে অযৌক্তিক কারণে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন নম্বর, ই-রিটার্নের প্রমাণ ও কেওয়াইসি (KYC) যাচাই করে সঞ্চয়পত্র ইস্যু করতে ব্যাংকগুলো বাধ্য।
অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা পরিদর্শনকালে দেখতে পান, অনেক শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গ্রাহকদের ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছেন না। উদাহরণস্বরূপ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পুরান ঢাকার ধোলাইখাল শাখায় সঞ্চয়পত্র কিনতে যাওয়া নূরজাহান বেগম নামের এক গ্রাহককে “সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় না” বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং পাশের মিডল্যান্ড ব্যাংকও তাকে একই আচরণ করে বিদায় দেয়। এমনকি কিছু শাখার প্রধানেরা দ্বিতীয়বার নিশ্চিত করতে গেলেও একই নেতিবাচক জবাব দেন এবং দাবি করেন যে তাদের শাখায় কোনোদিন সঞ্চয়পত্র বিক্রিই করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ইস্তেকমাল হোসেন অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পরিচয় গোপন রেখে ১০টি দল ৪০টি ব্যাংকের শাখায় বাস্তব চিত্র জানার চেষ্টা করেছে এবং সেখানে মারাত্মক সব অসংগতি ধরা পড়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সব ব্যাংক সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে বাধ্য। তারা যদি সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের আইডি বা পাসওয়ার্ড না-ও পেয়ে থাকে, তবে গ্রাহকের নথিপত্র নিয়ে প্রাপ্তি স্বীকারোক্তি দেবে এবং ফরমে সংশ্লিষ্ট শাখার নাম লিখে দেবে।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান যে, এই বিশেষ ঝটিকা অভিযান আগামী দিনগুলোতেও চলমান থাকবে। এখন থেকে আর খেয়ালখুশিমতো কোনো যোগ্য গ্রাহককে ব্যাংক থেকে ফেরত দেওয়া যাবে না। কোনো ব্যাংক এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র— এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে, যেখানে মেয়াদ পূর্তিসাপেক্ষে সুদের হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। গত ২৪ জুনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সব ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহীদের নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যার প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে না পাওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ নিল কমিশন।