
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান প্রতিকূলতা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আজ মঙ্গলবার নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বেলা ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) এই মুদ্রানীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার পরিস্থিতি ও নিত্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না আসায় এবারের মুদ্রানীতিতেও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে নীতি সুদহার আগের মতো ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রেখে আবারও সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতির ধারা অব্যাহত রাখার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় নামানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের ধাক্কা থেকে যে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির সূত্রপাত হয়েছিল, তা আজও অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে।
২০২২ সালের জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে ২০২৬ সালের মার্চে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এলেও তা স্থায়ী হয়নি; চলতি বছরের মে মাসে তা আবার বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দুর্বল বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ শৃঙ্খল সমস্যা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপের কারণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ পদক্ষেপের পরও জুন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাদ্যের পাশাপাশি বর্তমানে পরিবহন এবং আবাসন-জ্বালানি খাতও মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। গত এক বছরে পরিবহন খাতে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে উঠেছে। অপরদিকে আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর ফলে গ্যাস, পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধাপে ধাপে কমবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না; বরং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক করার ওপর এটি নির্ভর করছে।
এর পাশাপাশি, মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ঘোষিত ৬০…০০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিলের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই তহবিলের উদ্বৃত্ত তারল্য যাতে কোনোভাবেই অনুৎপাদনশীল খাতে গিয়ে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি না করে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজরদারি বজায় রাখা হবে। আজ বেলা ৩টার পর নতুন মুদ্রানীতির সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।