ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক

অর্থনীতি প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ৫ দিন আগে

দেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পদে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং এর ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের সামগ্রিক তারল্য ও আমানত ব্যবস্থাপনার ওপর একটি বিশেষ পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের একাংশের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যার ফলে সাময়িকভাবে আমানত উত্তোলনের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নগদ জমার অনুপাত (সিআরআর) ও চলতি হিসাবের ব্যালেন্স ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিশেষ তারল্য সহায়তার আবেদন জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য:

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের চলমান যেকোনো পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এবং তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো পরিস্থিতি সুশৃঙ্খলভাবে মোকাবেলা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তারল্য সহায়তার আবেদন জমা পড়েছে নিশ্চিত করে তিনি জানান, আবেদনটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

আমানত ও চলতি হিসাবের পরিসংখ্যান:

ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ৩১ মে ব্যাংকের মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, যা সাম্প্রতিক উত্তোলনের চাপের কারণে গত ৭ জুন নাগাদ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সাময়িক উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকার আমানত স্থানান্তরিত বা উত্তোলিত হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল যেখানে আমানত ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯ignored১৯ কোটি টাকা, সেখানে এক মাসের ব্যবধানে মোট আমানত হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে এখনো পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। তবে সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) বা বাধ্যতামূলক নগদ জমার ক্ষেত্রে সাময়িক ঘাটতি এড়াতে এবং ভবিষ্যতের আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এই বিশেষ সহায়তার আবেদন করা হয়েছে। আগে যেখানে চলতি হিসাবে ৭ হাজার ১৫ কোটি টাকার বেশি স্থিতি ছিল, সেটি সাময়িক চাপের কারণে বর্তমানে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে।

অতীতের সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস:
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপের অনিয়ম ও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ২০২২ সালে জনসমক্ষে এলে ব্যাংকটি বড় ধরনের সিআরআর ঘাটতি এবং ঋণাত্মক চলতি হিসাবের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর যথাযথ নীতিমালার আলোনে ব্যাংকটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সিআরআর ঘাটতি কাটিয়ে উঠে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি হিসাবে বড় অঙ্কের ইতিবাচক ব্যালেন্স (৭ হাজার ১৫ কোটি টাকা) জমা করতে সক্ষম হয়েছিল ইসলামী ব্যাংক।

বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত ও গ্রাহকদের দাবি:
চলতি বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে (২৪ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিনে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। খুরশীদ আলম পূর্বে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর এই নতুন নিয়োগের বিরোধিতা করে গত ১ জুন থেকে ব্যাংকের সচেতন গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার ফোরামের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি ও মানববন্ধন পালিত হচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে এবং দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখায় এই অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারী সাধারণ ও নারী গ্রাহকদের দাবি, ব্যাংকের শীর্ষ পদে এমন নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হোক যা সাধারণ আমানতকারীদের মনে পূর্ণ আস্থা বজায় রাখতে এবং জমানো অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শতভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ব্যাংক প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে এই সাময়িক সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

error: Content is protected !!