দেশজুড়ে ডিমের বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, কয়েক মাস ধরে কম দামে বিক্রির কারণে অনেক লেয়ার খামার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে রোগের প্রভাব ও সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় বাজারে ডিমের দাম বেড়েছে।
নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার খামারিরা জানান, দীর্ঘ সময় উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রি করায় অনেক খামারি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে বাজারে ডিমের সরবরাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। বর্তমানে চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়তির দিকে রয়েছে।
খামার মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিমের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি আনলেও আগের কয়েক মাসের ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। তাদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, দেশের ডিমের বাজারে অসংখ্য উৎপাদক ও ব্যবসায়ী থাকায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিদ্যমান। তাই বাজার পরিস্থিতি মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করেই পরিবর্তিত হচ্ছে। নোয়াখালীর পোল্ট্রি শিল্পে ভয়াবহ মন্দা দেখা দিয়েছে। টানা কয়েক মাসের লোকসান, বার্ড ফ্লু এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক খামারিদের মধ্যে হাহাকার বিরাজ করছে। জেলার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খামার এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে।
উৎপাদন সংকটে দিশেহারা খামারিরা
সদর উপজেলার নূরপুর এলাকার খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন খরচের তুলনায় ডিমের দাম কম হওয়ায় গত ৭-৮ মাস ধরে তারা প্রতি ডিমে গড়ে ২ টাকার বেশি লোকসান গুনেছেন। অনেক খামারি ডিলারদের দেনা পরিশোধ করতে না পেরে তাদের উৎপাদনশীল মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে বাজারে ডিমের সরবরাহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
খামারি মো. মুনির উদ্দিন জানান, লোকসানের কারণে তার একটি শেডের দুই হাজার ডিমপাড়া মুরগি বিক্রি করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন, যেখানে তার প্রায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে চাহিদা বাড়ায় নতুন করে খামার শুরু করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি শঙ্কিত।
রোগবালাই ও উৎপাদন খরচ
কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার খামারিদের মতে, শুধুমাত্র আর্থিক লোকসানই নয়, ভাইরাসজনিত মড়কও এই সংকটের বড় কারণ। অনেক খামারে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মুরগি মারা গেছে। খামারি মেজবাহ উদ্দিন সুজন জানান, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে প্রায় ৯.৫০ টাকা খরচ হলেও তাদের ৭.৩০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং পরিবহণ খরচ বাড়ায় খামারি ও পাইকারি বিক্রেতা উভয়েই চাপের মুখে পড়েছেন। মাইজদী পৌর বাজারের আড়তদার জসিম উদ্দিন বলেন, গত তিন সপ্তাহ ধরে বাজারে ডিমের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
করপোরেট প্রভাব ও সিন্ডিকেট আতঙ্ক
ক্ষুদ্র খামারিদের অভিযোগ, বড় কোম্পানিগুলো ডিম ও মুরগির ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত থাকায় প্রান্তিক খামারিরা সারা বছর কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারছেন না। খামারিরা যখনই একটু বাড়তি দামের দেখা পান, তখনই ‘সিন্ডিকেট’ নাম দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আব্দুল শাহেদ।
খামারিদের দাবি, আগামী কয়েক মাস খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১১ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে না থাকলে অধিকাংশ লেয়ার খামার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে দেশে ডিমের বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদেশ থেকে ডিম আমদানির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।