বাংলাদেশে কৃষি সহায়তার সবচেয়ে বড় অংশটি দেওয়া হয় সারে ভর্তুকি হিসেবে, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ। এই ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন সচল রাখতে ও পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করলেও, সার ক্রয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেশি জমির অধিকারী কৃষকরাই এর বেশিরভাগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ ভূমিমালিক সার ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা ভোগ করেন, যেখানে তলানির ৪০ শতাংশ প্রান্তিক কৃষক পান মাত্র ১৫ শতাংশ সুবিধা।
রাজধানীতে গতকাল সোমবার (১৫ জুন) বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্যব্যবস্থায় মানসম্মত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
কৃষি প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়নের ভারসাম্যহীনতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি খাতকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামগ্রিক কৃষি প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার দুর্বল হয়েছে এবং উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যে বৈচিত্র্য আনার অগ্রগতি কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। অথচ দেশের বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা ক্রমেই ফল, সবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ সার ভর্তুকি ও ধানকেন্দ্রিক সহায়তায় ব্যয় হলেও কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং কৃষকের আয় বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো যেমন— উন্নত গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ ও পরামর্শসেবা, সেচ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বাজারসংযোগ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির মতো উপখাতগুলো তুলনামূলকভাবে কম অর্থায়ন পাচ্ছে।
সারের ব্যবহারে বড় ব্যবধান
প্রতিবেদনে সারের সুষম ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে। দেশের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কৃষক কৃষি বিভাগ কর্তৃক সুপারিশ করা মাত্রার মধ্যে সুষম পুষ্টি উপাদানের সার ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভারসাম্যহীনতা দূর করে সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মাঠপর্যায়ে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব, যা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে।
উচ্চমূল্যের উপখাত ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য ও সরবরাহের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা কৃষিনীতি ও ব্যয়ের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। সহায়তা দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং ধীরে ধীরে কৃষি ব্যয়কে অধিক ফলদায়ক ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের দিকে পুনর্বিন্যাস করতে পারলে বাংলাদেশ আরও সহনশীল কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা ভালো মজুরির কর্মসংস্থান তৈরি করবে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ সুবিধা ধান চাষের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে রয়েছে, যা কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পথে বড় বাধা। দেশের মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয়। অথচ প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, সবজি এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো উচ্চমূল্যের উপখাতগুলো গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের সহ-লেখক মনসুর আহমেদ বলেন, সারের ভর্তুকির নকশা ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন করলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং প্রকৃত প্রয়োজন থাকা প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।